রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, শিশুদের জন্য হামের টিকার ব্যবস্থা না করা বিগত দুই সরকারের “ক্ষমাহীন অপরাধ”। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে, যার ফলে সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে শ্রেষ্ঠ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের মধ্যে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সারাদেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত দুই সরকারের জীবনবিনাশী ব্যর্থতা ক্ষমাহীন অপরাধ। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য দ্রুত টিকা কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।” তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ধন্যবাদ জানান এবং নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্যখাত নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে মাতৃস্বাস্থ্য, নিরাপদ প্রসব, নবজাতক ও শিশু চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সহজলভ্য করতে চিকিৎসকদের মানবিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, চিকিৎসা পাওয়া নাগরিকের অধিকার, এটি রাষ্ট্রের করুণা নয়। স্বাস্থ্যসেবাকে জবাবদিহিমূলক করতে হবে এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে হবে।
সরকার শিগগিরই সমন্বিত ই-হেলথকার্ড চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে এবং দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজে চিকিৎসা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে চিকিৎসা ব্যয়ে মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তিনি জানান, ধাপে ধাপে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের পাঁচ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং প্রায় এক লক্ষ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে, যার অধিকাংশই নারী হবেন।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে চিকিৎসক ও কর্মীদের নিরাপত্তা, আবাসন ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধানের আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সব সমস্যা একসাথে সমাধান সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে। চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিজ নিজ এলাকায় মানবিক ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলবেন। জনগণের দোরগোড়ায় কার্যকর সেবা পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।
একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বরিশালের এক প্রসূতি রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অসতর্কতার কারণে জটিলতা তৈরি হয়, যা পরে হস্তক্ষেপে সমাধান হয়। তিনি চিকিৎসকদের আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান যাতে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে না হয়।
সম্মেলনে কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ছয়জন উপজেলা চিকিৎসককে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আরো উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মন্ত্রী সাহেব প্রশংসা একটু কম, স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বললেন প্রধানমন্ত্রী: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বারবার প্রধানমন্ত্রীর নানা কাজের প্রশংসা করায় তারেক রহমান বললেন ‘মন্ত্রী সাহেব প্রশংসা একটু কম’। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শনিবার (১৮এপ্রিল) উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এসময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেন।
এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বক্তৃতাকালে বারবার প্রধানমন্ত্রীর নানা কাজের প্রশংসা করায় তারেক রহমান বলে ওঠেন মন্ত্রী সাহেব প্রশংসা একটু কম। এসময় মিলনায়তনজুড়ে থাকা সবাই করতালি দেন। সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রশংসা করি নাই যতটুকু আপনি বলতেছেন সামান্য বলেছি’।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বক্তৃতায় বলেন, দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে সবাইকে পরিবর্তনের অংশ হতে হবে এবং মানবসেবাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন ,সরকার প্রধান ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন, যার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতসহ সব ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিরলসভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। সংসদে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন। তার এই নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলেই প্রধানমন্ত্রী এযাবতকালের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠক। তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ১০০ জন মানুষের ভেতরে উনার কর্ম উনাকে জায়গা করে দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে গ্রাম পর্যায়ের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে আগ্রহী। তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের কথা আমি শুনবো, তাদের মতামত গুরুত্ব দেবো এবং তাদের জন্য কাজ করবো। বিনিময়ে তারা দেশের মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখবেন, প্রধানমন্ত্রীর এই প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের বিকল্প নেই। তাই তাদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং কাজের পরিবেশ উন্নত করা সরকারের অগ্রাধিকার।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত লোকজনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। উপজেলা হাসপাতাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ খাতে উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সানা/আপ্র/১৮/৪/২০২৬