দেশে কিডনির রোগ এখন নীরব মহামারি হিসেবে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা। তাঁদের মতে, প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষ শেষ ধাপের কিডনি বিকলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। শুধু ডায়ালাইসিস বা চিকিৎসা বৃদ্ধি করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; বরং আইনি, কারিগরি ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন।
শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর মিরপুরে কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সম্মেলনের আয়োজন করে কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, রাফায়েল ইন্টারন্যাশনাল, কোরিয়ার ভাইটালিংক, ডানভিট ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি দেশি-বিদেশি সংস্থা। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জীবিত ও মৃত দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন’।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে অঙ্গদান, কিডনি প্রতিস্থাপন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মৃত ব্যক্তির অঙ্গদান কার্যক্রম জোরদার করার বিষয়ে একটি বিশেষ কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়। দুই দিনের এই আয়োজনে মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ স্থায়ী মৃত্যু নির্ধারণ, অঙ্গ সংগ্রহ, দাতা সমন্বয়, নৈতিক ও আইনগত বিষয় এবং হাসপাতালভিত্তিক অঙ্গদান ব্যবস্থা উন্নয়ন নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে জীবিত ও মৃত উভয় দাতার কাছ থেকেই অঙ্গ নেওয়ার বিষয়টি সময়ের সঙ্গে আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, “এই ক্ষেত্রে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। মানুষকে অঙ্গদানে উৎসাহিত করতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে কিডনির রোগ কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা এখনই গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। শুধু রোগ ধরা পড়ার পর চিকিৎসা বা প্রতিস্থাপনের ওপর নির্ভর না করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর দেওয়া জরুরি, যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং কার্যকর। তাঁর মতে, সমন্বিত উদ্যোগ, সামাজিক সচেতনতা এবং সর্বস্তরের অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বাংলাদেশে কিডনির রোগ এখন নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী শেষ ধাপের কিডনি বিকলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন, যা একটি বড় স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন সেবা এখনও যথেষ্ট নয়।
তিনি আরো বলেন, শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করলে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।
কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হারুন-অর-রশীদ বলেন, দেশে দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগে আক্রান্ত মানুষের হার প্রায় ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ। প্রতিবছর নতুন করে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হলেও ডায়ালাইসিস সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার রোগী। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
তিনি জানান, সংকট মোকাবিলায় ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দেওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির অঙ্গদান প্রসারে কিডনি ফাউন্ডেশন প্রথমবারের মতো ‘ট্রান্সপ্ল্যান্ট কো-অর্ডিনেটর’ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে, যা ভবিষ্যতে কিডনি চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সম্মেলনে ভিডিও বার্তায় অংশ নেন দক্ষিণ কোরিয়ার অলাভজনক সংস্থা ডানভিট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হি ইয়ং শিন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ট্রান্সপ্লান্টেশন জার্নালের প্রধান সম্পাদক জেরেমি চ্যাপম্যান বলেন, অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সফল করতে সমাজ, ধর্মীয় নেতৃত্ব, স্বাস্থ্য খাত ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জনসচেতনতা এবং শক্তিশালী স্বাস্থ্য কাঠামো।
সবশেষে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে কিডনির রোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে সামনে এসেছে। তাই দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই চাপ আরো বাড়বে বলে তাঁরা সতর্ক করেন।
সানা/আপ্র/২৮/৬/২০২৬