প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণায় নতুন করে আশার আলো দেখছে কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন ব্যবসায়িক এলাকা। দীর্ঘ সময় ধরে ভিসা স্থগিত থাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতান, মানি এক্সচেঞ্জ, পরিবহনসেবা এবং ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভয়াবহ মন্দার মধ্য দিয়ে সময় পার করেছে। এখন ভিসা চালুর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এসব খাতে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত ২৫ জুন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেন, ২৯ জুন থেকে বাংলাদেশি নাগরিকরা পুনরায় পর্যটন ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে ঢাকাসহ পাঁচটি ভিসা আবেদনকেন্দ্রের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়। দীর্ঘ দুই বছরের স্থবিরতার পর এই ঘোষণাকে দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও পর্যটন শিল্প পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘোষণার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সবচেয়ে বেশি স্বস্তি ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে কলকাতার নিউ মার্কেট, মারকুইজ স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড এবং কলিন লেন এলাকায়। এই এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল একটি বিশেষ অর্থনৈতিক বলয় হিসেবে পরিচিত। চিকিৎসা, কেনাকাটা, ভ্রমণ এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসা বাংলাদেশি পর্যটকেরাই এখানে আবাসন ও খরচের বড় অংশ জোগান দিতেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনার পর বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা স্থগিত হয়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। নিয়মিত পর্যটক প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ব্যবসাকেন্দ্র স্থবির হয়ে পড়ে। আগে যেখানে দিনভর মানুষের ভিড়ে মুখর থাকত নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকা, সেখানে হঠাৎ করেই নেমে আসে শূন্যতা। হোটেলগুলোতে কক্ষ খালি পড়ে থাকে দিনের পর দিন, রেস্তোরাঁগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যায়, এবং দোকানপাটে বিক্রি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।
পোশাক, প্রসাধনী, চকলেট, শুকনো ফল, জুতা, ব্যাগ ও উপহার সামগ্রীর দোকানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে মানি এক্সচেঞ্জ, পরিবহনসেবা এবং স্থানীয় ট্যাক্সি-অটোভিত্তিক ব্যবসাও বড় ধরনের সংকটে পড়ে। পর্যটকনির্ভর এই অর্থনৈতিক কাঠামো একেবারে ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছে যায় বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, গত প্রায় দুই বছরে নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন এলাকার সামগ্রিক ব্যবসা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। আগে প্রতিদিন হাজারো বাংলাদেশি পর্যটকের আগমনে যে চাঞ্চল্য তৈরি হতো, তা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়। ফলে অনেক ব্যবসায়ী কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হন, কেউ ব্যবসার পরিসর কমিয়ে আনেন, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কলকাতার এই অঞ্চলে প্রায় ৩৫০টির বেশি ছোট-বড় হোটেল ও অতিথিশালা রয়েছে, যেগুলোর মূল গ্রাহক ছিলেন বাংলাদেশি পর্যটকরা। ভিসা বন্ধ হওয়ার আগে এসব হোটেলের অধিকাংশ কক্ষ প্রায় সারাবছরই বুকিং থাকত। কিন্তু পর্যটক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কক্ষ দখলের হার অর্ধেকে নেমে আসে। একই সঙ্গে কক্ষভাড়া প্রায় দুই হাজার রুপি থেকে কমে নয়শ থেকে এক হাজার রুপির মধ্যে নেমে আসে। তবুও পর্যাপ্ত অতিথি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নিউ মার্কেট সংলগ্ন সস্তা হোটেল ও গেস্টহাউসগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। ভিসা বন্ধ থাকায় এসব হোটেলে খালি কক্ষই ছিল বেশি -ছবি সংগৃহীত
এই পরিস্থিতিতে শুধু হোটেল খাতই নয়, পুরো মধ্য কলকাতার ব্যবসায়িক কাঠামোই চাপের মুখে পড়ে। মারকুইজ স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও সংলগ্ন এলাকায় যেসব রেস্তোরাঁ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেগুলোর আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অনেক রেস্তোরাঁয় আগের তুলনায় ক্রেতা সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসে। একইভাবে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর। নিউ মার্কেট এলাকার প্রায় তিন হাজার দোকানের একটি বড় অংশই বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। পোশাক, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিকস, জুতা, ব্যাগ, উপহার সামগ্রী ও শুকনো ফলের ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক দোকানে দিনের শেষে বিক্রির পরিমাণ এতটাই কমে যায় যে তা আগের দিনের তুলনায় নগণ্য হয়ে দাঁড়ায়।
এসএস হগ মার্কেট ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অশোক গুপ্ত বলেন, ভিসা স্থগিত হওয়ার আগে যে পরিমাণ বিক্রি এক দিনে হতো, এখন সেই পরিমাণ বিক্রি করতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসা এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে অনেক দোকানদার ব্যক্তিগত সঞ্চয় ব্যবহার করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হন। কেউ কেউ কর্মচারী সংখ্যা কমিয়ে দেন, আবার অনেকে সম্পূর্ণ ব্যবসা বন্ধের ঝুঁকিতে পড়েন।
এদিকে পর্যটক সংকটের কারণে শুধু দোকানপাট নয়, পরিবহন খাতেও বড় ধস নামে। ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার ভাড়া, ট্রাভেল এজেন্সি এবং স্থানীয় পরিবহনসেবাগুলোতে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসাও একই ধরনের চাপের মুখে পড়ে, কারণ বিদেশি মুদ্রা লেনদেন কমে যাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন আয় হ্রাস পায়।
হোটেল ও গেস্টহাউস মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটক কমে যাওয়ার ফলে শুধু দখল হারই নয়, ব্যবসার স্থায়িত্বও ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনেক ছোট হোটেল ধার-দেনা করে টিকে থাকার চেষ্টা করে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এই অবস্থা চলতে থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
ক্যালকাটা হোটেলস, গেস্ট হাউসেস অ্যান্ড রেস্টুরেন্টস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হরমিত সিং বলেন, এই অঞ্চল মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল একটি অর্থনৈতিক বলয়। তাঁদের অনুপস্থিতি মানে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চাকা থেমে যাওয়া। তিনি জানান, পর্যটক না থাকায় শুধু হোটেল নয়, আশপাশের সব ব্যবসাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশি পর্যটকেরা সাধারণত এক বা দুই দিনের পরিবর্তে দীর্ঘ সময় কলকাতায় অবস্থান করেন। চিকিৎসা, কেনাকাটা বা পারিবারিক প্রয়োজনে তাঁরা এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় থাকেন। ফলে তাঁদের ব্যয় স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে—হোটেল, খাবার, পরিবহন, কেনাকাটা, চিকিৎসা ও অর্থ বিনিময় সব ক্ষেত্রেই।
এই দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণে নিউ মার্কেট এলাকায় আগের তুলনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেক কমে যায়। একসময় যে এলাকাকে কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তা ধীরে ধীরে নীরবতায় ঢেকে যায়। ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন, কোনোভাবে পর্যটক প্রবাহ ফিরে এলে এই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাবে।
কলকাতার নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন মারকুইজ স্ট্রিটে কেনাকাটায় ব্যস্ত পর্যটক ও স্থানীয়রা—এক সময়ের এই চিত্রই আবার ফিরবে বলে আশায় ব্যবসায়ীরা -ছবি সংগৃহীত
পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণার পর এখন ব্যবসায়ীদের প্রধান প্রত্যাশা দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন ভিসা প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়া। তাঁদের মতে, কেবল ঘোষণা নয়, বাস্তবভাবে আবেদন গ্রহণ, অনুমোদন এবং ভিসা ইস্যু নিয়মিতভাবে চললে তবেই পর্যটক প্রবাহ আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে। দীর্ঘ সময়ের স্থবিরতার কারণে অনেক বাংলাদেশি পর্যটক ইতোমধ্যে বিকল্প গন্তব্য বেছে নিয়েছেন, ফলে আস্থা পুনর্গঠনকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীরা আরও মনে করছেন, ভিসা চালুর পর প্রথম দিকে ধীরে ধীরে পর্যটক সংখ্যা বাড়বে। একবার নিয়মিত যাতায়াত শুরু হলে কয়েক মাসের মধ্যেই হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন এলাকার অর্থনীতি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।
কলকাতার পর্যটন ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশি পর্যটকেরা শুধু সংখ্যার দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নন, তাঁদের ব্যয়ের ধরনও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা সাধারণত দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং একাধিক খাতে ব্যয় করেন। ফলে তাঁদের উপস্থিতি এককভাবে হোটেল খাত নয়, বরং পুরো সেবাখাতকে সক্রিয় রাখে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশি ও ভারতীয় পর্যটকদের পারস্পরিক যাতায়াত দুই দেশের অর্থনীতির জন্যই ইতিবাচক। এতে শুধু পর্যটন নয়, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন এবং খুচরা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাত লাভবান হয়। দীর্ঘমেয়াদি ভিসা স্থিতিশীলতা এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলছেন, অতীতে যেভাবে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, ভবিষ্যতে তা পুনরাবৃত্তি হলে ব্যবসা আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তাঁরা চান ভিসা কার্যক্রম যেন ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য থাকে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের মন্দা কাটিয়ে কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ আবারও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। ব্যবসায়ীদের আশা, বাংলাদেশি পর্যটকদের পদচারণায় আবারও মুখর হয়ে উঠবে নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকা, সচল হবে হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে হাজারো দোকান, আর ফিরে আসবে সেই পুরোনো অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার পত্রিকা, ইন্ডিয়া টুডে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
সানা/আপ্র/২৮/৬/২০২৬