ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সাংবাদিক রিতিকা চোপড়া। দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
তবে রিতিকার সাংবাদিকতা জীবন শুধু এই একটি প্রতিবেদনকে ঘিরে নয়। প্রায় ১৯ বছর ধরে রাজনীতি, সরকার, শিক্ষা, জননীতি ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তথ্য ও নথিনির্ভর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্যও পরিচিতি পেয়েছেন।
কলকাতা থেকে দিল্লি, এরপর মুম্বাই
কলকাতায় জন্ম রিতিকা চোপড়ার। সেখানকার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে গণযোগাযোগ ও ভিডিওগ্রাফিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
২০০৬ সালে হিন্দুস্তান টাইমসে শিক্ষানবিশ হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন রিতিকা। পরের বছর দিল্লিতে গিয়ে রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, সামাজিক খাত ও সরকারি নীতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে থাকেন।
পরবর্তী সময়ে ভারতের আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমসের রাজনৈতিক বিভাগে কাজ করেন তিনি। সেখানে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার পাশাপাশি সরকারের নীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
২০১৫ সালে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে যোগ দেন রিতিকা। সেখানে প্রথমে জাতীয় শিক্ষা সম্পাদক এবং পরে কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রমবিষয়ক জাতীয় ব্যুরোপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় সরকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেন তিনি।
বর্তমানে তিনি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মুম্বাই সংস্করণের আবাসিক সম্পাদক। মুম্বাই ও আশপাশের অঞ্চলের সংবাদ সংগ্রহ এবং সম্পাদকীয় কার্যক্রম তদারক করছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছে
ভারতের নির্বাচন কমিশন রিতিকার সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ও নির্বাচনী প্রশাসনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছেন।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তার সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতের তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী গত ১০ মাসে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
দুই কমিশনারের অভিযোগ, তাদের অজ্ঞাতে ভোটার তালিকা সংশোধন, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি এবং ভোটারদের নাম বাদ দেওয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল।
প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন ভোটার নিবন্ধনের আবেদনপত্রে পরিবর্তন, ভোটার তালিকার তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা এবং স্থানীয় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা সীমিত হওয়ার অভিযোগ।
বিশেষ করে নতুন ভোটার নিবন্ধনের আবেদনপত্রে বিশেষ নিবিড় সংশোধনসংক্রান্ত প্রশ্ন যুক্ত করার বিষয়ে আপত্তি জানান দুই কমিশনার। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
এ ছাড়া ভোটার তালিকার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দুই কমিশনার পৃথকভাবে ভারতের মন্ত্রিপরিষদ সচিবকেও চিঠি দিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
রিতিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের লক্ষ্যে সংসদে প্রস্তাব আনার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন বিরোধী দলের নেতারা।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের আগে ২১ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। দুই নির্বাচন কমিশনারের কাছেও বক্তব্য চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তাদের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকতায় একের পর এক স্বীকৃতি
রিতিকা চোপড়ার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে রয়েছে একাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি।
২০১৮ সালে তিনি পান ইউএনএফপিএ-লাডলি গণমাধ্যম পুরস্কার। হরিয়ানার পঞ্চায়েত নির্বাচনে অশিক্ষিত প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিষিদ্ধ করার আইন বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় নিয়ে প্রতিবেদনের জন্য এ পুরস্কার পান তিনি।
ভারতের প্রকৌশল শিক্ষার মান নিয়ে চার পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ডিভ্যালুড ডিগ্রি’র জন্য একই বছর এসিজে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কারে বিশেষ স্বীকৃতি পান।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জন্য ২০২১ সালে অর্জন করেন রামনাথ গোয়েঙ্কা সাংবাদিকতা উৎকর্ষ পুরস্কার।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে পান আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউটের ভারতীয় সাংবাদিকতা উৎকর্ষ পুরস্কার।
২০২৪ সালে তিনি অর্জন করেন বর্ষসেরা নারী গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে চামেলি দেবী জৈন পুরস্কার। সরকারি নীতি প্রণয়নের ঘাটতি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য তাকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে সরকারি নীতি, নির্বাচনী প্রশাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা রয়েছে রিতিকার। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি তার সেই কাজেরই ধারাবাহিকতা।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও দ্য ইন্ডিয়ান আওয়াজ।
এসি/আপ্র/২৬/৯/২০২৬