ওজন ও শরীরের মেদ কমানোর প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতির বাইরে নতুন এক ইনজেকশন নিয়ে আশাব্যঞ্জক ফল পেয়েছেন গবেষকেরা। ‘সিবিএল-৫১৪’ নামের পরীক্ষাধীন ওষুধটি চর্বিকোষের আকার ছোট করার পরিবর্তে সেগুলোকে ধ্বংস করতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ত্বকের নিচে জমে থাকা চর্বির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চারপাশে জমে থাকা চর্বি কমানোরও সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে গবেষণার ফল এখনো সহকর্মী গবেষকদের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি। তাই এ ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি।
ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা সিবিএল-৫১৪ নিয়ে গবেষকেরা বলছেন, এটি ত্বকের ঠিক নিচে জমে থাকা চর্বি বা অধস্তকীয় মেদ কমানোর পাশাপাশি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে জমে থাকা অভ্যন্তরীণ মেদ কমাতেও কার্যকর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বার্মিংহামে অবস্থিত আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তঃক্ষরা বিশেষজ্ঞ টিমোথি গার্ভি এ গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, চর্বি কমার ফলে পেটের আকারে পরিবর্তনের মতো প্রসাধনগত সুবিধা রোগীদের সন্তুষ্ট করতে পারে। তবে শরীরের ওজন ও অভ্যন্তরীণ মেদ কমার পাশাপাশি রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের উন্নতি ঘটলে তা স্বাস্থ্যের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হবে।
গবেষণার ফল এখনো কোনো বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে পর্যালোচিত নিবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়নি। বরং গবেষণা সম্মেলন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা সামনে এসেছে। এ কারণে ফলাফলগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
দুটি পরীক্ষায় মিলেছে প্রাথমিক সাফল্য: সিবিএল-৫১৪ নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের দুটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সিবিএল-০২০৪ ও সিবিএল-০২০৫ নামের এ দুটি পরীক্ষায় যথাক্রমে ১০৭ ও ১৭৩ জন স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবকের ত্বকের নিচে জমে থাকা চর্বি কমাতে ওষুধটি কার্যকর ছিল।
পরবর্তী সময়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪১ জনের একটি দলের অভ্যন্তরীণ মেদের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, টানা ১২ সপ্তাহ সিবিএল-৫১৪ ইনজেকশন নেওয়া ব্যক্তিদের অভ্যন্তরীণ মেদ গড়ে ১২ দশমিক ০১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ওষুধের পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় বিকল্প চিকিৎসা বা প্লাসিবো নেওয়া ব্যক্তিদের শেষ ইনজেকশনের চার সপ্তাহ পর অভ্যন্তরীণ মেদ গড়ে ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ মারি স্প্রেকলি বলেন, প্রাথমিক ফলাফল থেকে আশ্বাস পাওয়া যায় যে সিবিএল-৫১৪ পেটের ভেতরের মেদ কমাতে পারে। তবে এ প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় কি না এবং এর ফলে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে কি না, তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহত্তর পরিসরের পরীক্ষা প্রয়োজন।
ওজন ফিরে আসা ঠেকানোর সম্ভাবনা: প্রাণীর ওপর চালানো পরীক্ষায় সিবিএল-৫১৪ নিয়ে আরো কিছু সম্ভাবনাময় ফল পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় ওজন কমানোর ওষুধ টিরজেপাটাইডের সঙ্গে সিবিএল-৫১৪ প্রয়োগ করা ইঁদুরগুলো শুধু টিরজেপাটাইড পাওয়া ইঁদুরের তুলনায় বেশি ওজন হারিয়েছে।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসা বন্ধ করার পরও দুটি ওষুধ পাওয়া ইঁদুরগুলোর ওজন সহজে বাড়েনি। সাধারণত দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিএলপি-১ গোত্রের ওষুধ বন্ধ করলে হারানো ওজন ফিরে আসতে পারে। গবেষকদের ধারণা, সিবিএল-৫১৪ চর্বিকোষ ধ্বংস করায় ওজন পুনরায় বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা মানুষের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপাকক্রিয়া গবেষক জাস্টিন রচফোর্ড সতর্ক করে বলেছেন, স্থূলতার কার্যকর চিকিৎসায় শরীরের অন্য অঙ্গে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ছে কি না এবং রক্তে শর্করা ও চর্বির স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
গবেষকেরা এখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করছেন। মূলত ত্বকের নিচে চর্বির পিণ্ড বা লাইপোমা দূর করার উদ্দেশ্যে সিবিএল-৫১৪ তৈরি করা হয়েছিল। তবে চর্বিকোষকে লক্ষ্য করে কাজ করার এ পদ্ধতি স্থূলতার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
টিমোথি গার্ভির মতে, স্থূলতার ওষুধভিত্তিক চিকিৎসায় এটি একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি, যা মানুষের ওপর প্রাথমিক পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য ফল দেখিয়েছে। তবে বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘস্থায়ী সুফল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। সূত্র: সায়েন্স এলার্ট
সানা/ডিসি/আপ্র/১৮/১০/২০২৬