ইসরায়েলে সদ্য অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় আসার সুযোগ না দিয়ে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের দাবিতে রাজপথে নামছেন দেশটির একাংশের নাগরিক। ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠীর সমান রাজনৈতিক অধিকার এবং যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সরকার গঠনের দাবিতে শনিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় তেল আবিব, জেরুজালেমসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতেও একই দাবিতে বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকটের বাড়ির সামনে জড়ো হন বহু মানুষ। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। বিক্ষোভকারীদের দাবি, আরব নাগরিকদের ভোটের মূল্য ইহুদি নাগরিকদের ভোটের সমান। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরও পূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ নামের একটি সংগঠন শনিবারের কর্মসূচির আয়োজন করেছে। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতায় তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ার, জেরুজালেমের প্যারিস স্কয়ার, বীরশেবা, হাইফা ও তাইবেতে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আয়োজকদের বক্তব্য, পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেওয়া ইহুদি-আরব সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিফলন পরবর্তী সরকারেও থাকতে হবে। তাদের মতে, দুই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশীদারত্বকে আরো শক্তিশালী করে বাস্তব পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তর করার সময় এসেছে।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো দল বা জোট এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। দেশটির ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী ক্ষমতাসীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী ‘চেঞ্জ ব্লক’ পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরবদের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম পেয়েছে যথাক্রমে ১১ ও ৮টি আসন। সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর আসনসংখ্যা ৬৭।
আরবদের নেতৃত্বাধীন দুটি দল জয়েন্ট লিস্ট ও রাআমের এই সাফল্য নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভোটের আগে ইহুদি দলগুলোর কয়েকটি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফলে আরব দলগুলোর আসন বেড়ে যাওয়ায় তাদের সমর্থন ছাড়া বিরোধী শিবিরের সরকার গঠন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নির্বাচনের আগে দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার চাপ তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবার চেঞ্জ ব্লকের শরিক দল দ্য ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়ার গোলান এক সাক্ষাৎকারে জানান, বৃহস্পতিবার তিনি ইয়াশারের নেতা গাদি আইজেনকট, বি’ইয়াচাদের নেতা ইয়ার লাপিদ এবং রাআমের প্রধান মানসুর আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার গঠনের বিষয়ে তাদের মধ্যে গভীর প্রত্যয় রয়েছে। তবে বিরোধী জোটের শরিক ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যান এখনো আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করছেন। ফলে বিরোধী শিবিরের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে নিয়ে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, এমন সরকার গঠিত হলে তা হবে নেতানিয়াহুর আরেকটি সরকার, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। অন্যদিকে আরব দলগুলোর নেতারা নেতানিয়াহুবিরোধী বিকল্প সরকার গঠনে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে সমর্থন, অংশগ্রহণ ও আনুষ্ঠানিক জোটের প্রশ্নে দলগুলোর অবস্থান এক নয়।
সরকার গঠনের পাশাপাশি পার্লামেন্টের নেতৃত্ব নিয়েও বিরোধী শিবিরের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। সেদিন নির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের পর বর্তমান স্পিকার আমির ওহানাকে সরিয়ে নতুন স্পিকার নিয়োগ করতে চায় চেঞ্জ ব্লক। ইয়ার গোলান জানিয়েছেন, স্পিকার নিয়োগের পর পার্লামেন্টের বিভিন্ন কমিটির প্রধানও নির্ধারণ করা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক সেরির দাবি, আমির ওহানাকে সরানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে নতুন স্পিকার হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে আলোচনায় এলেও বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
ইসরায়েলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করবে। এরপর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবেন। ফলে এখনকার বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক আলোচনা কেবল সরকার গঠনের সমীকরণ নয়, দেশটির ইহুদি ও আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশীদারত্বের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা এবং নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়সংক্রান্ত মতপার্থক্য থাকায় চূড়ান্ত সমঝোতা সহজ হবে না। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৩১/১০/২০২৬