গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস আর অস্থিরতার খেলা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৪৮ পিএম, ০৪ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ০৭:৫১ এএম ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস আর অস্থিরতার খেলা
ছবি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি -ফাইল ছবি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী শামখানি এবং ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো অঞ্চলজুড়ে নজিরবিহীন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন সংকট নতুন নয়; কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতার মধ্যেই বর্তমান পরিস্থিতি গড়ে উঠেছে।

ইরানে গণতান্ত্রিক উদ্যোগ থেকে অভ্যুত্থান: ১৯৫০-এর দশকে তেল ও কৌশলগত প্রভাবের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে। ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক তেলশিল্প জাতীয়করণ করেন এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি-এর ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেন।

১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সঙ্গে সমন্বয়ে একটি অভ্যুত্থানে সহায়তা করে। নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয় এবং শাহর ক্ষমতা সুসংহত হয়। পরবর্তীতে শাহর নিরাপত্তা সংস্থা ‘সাবাক’ গঠনে সিআইএ সহযোগিতা করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৪৪৪ দিন কূটনীতিকদের জিম্মি রাখে। এরপর দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতার সূচনা ঘটে।
মস্কোর এইচএসই বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক নিকোলাই সুকহভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির মূল চালিকা শক্তি দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ।

সুয়েজ সংকট; উপনিবেশিক শক্তির অবসান: ১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ে সামরিক পরিকল্পনা করে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার তা সমর্থন করেননি।

ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক চাপের মুখে আগ্রাসী শক্তিগুলো পিছু হটে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রই প্রধান প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

ইরাক দ্রুত জয়, দীর্ঘ অস্থিরতা: ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে সামরিক অভিযান চালায়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন-এর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়। দ্রুত সামরিক সাফল্যের পর দেশটিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে। বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও আত্মঘাতী হামলা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। একই সময়ে আল-কায়েদা ইরাকে প্রভাব বিস্তার করে। বিশ্লেষকদের মতে, এ অভিযান আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়ালেও দুর্বল রাষ্ট্রে ওয়াশিংটনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।

লিবিয়ায় শাসন পতন, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: ১৯৮০-এর দশক থেকে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি-কে যুক্তরাষ্ট্র অস্থিতিশীলতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করত। ১৯৮৬ সালে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর মার্কিন বিমান হামলা চালানো হয়।

২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো গাদ্দাফিবিরোধী বাহিনীর পক্ষে হস্তক্ষেপ করে। একই বছরের আগস্টে ত্রিপোলি দখল হয় এবং পরে গাদ্দাফি নিহত হন। চার দশকের শাসনের অবসান হলেও লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফেরেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আবারো সক্রিয় হচ্ছে।

সিরিয়ায় প্রক্সি যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া: ২০১১ সালে সিরিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলন গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ কঠোর বলপ্রয়োগ করেন এবং রাশিয়া ও ইরানের সমর্থন পান।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করে গোপনে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেয়। সংঘাতের ভেতর থেকে ইসলামিক স্টেট-এর উত্থান ঘটে।

দীর্ঘ তেরো বছরের সংঘাতের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে আসাদ রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। বর্তমানে সিরিয়ায় অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব পালন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়া দেখিয়েছে কীভাবে বহুমুখী হস্তক্ষেপ প্রাথমিক কৌশলগত লক্ষ্য থেকে ভিন্ন ফল বয়ে আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও ফলাফল: অধ্যাপক নিকোলাই সুকহভের মতে, বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ প্রায়শই সরকার পরিবর্তন ও তেলক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল। একবিংশ শতাব্দীতে লক্ষ্য আরো বিস্তৃত-জ্বালানি পরিবহনপথ, বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা সেই দীর্ঘ কৌশলগত ধারাবাহিকতারই অংশ-যেখানে শাসন পরিবর্তন, সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক চাপ মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপের লক্ষ্য প্রথমে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার, পরবর্তীতে তেল ও জ্বালানি সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। তবে প্রায়শ দেশগুলিতে হস্তক্ষেপ মানবিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক নীতি একদিকে তার স্বার্থ নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে অঞ্চলটিতে সংঘাত ও ধ্বংসের চক্র সৃষ্টি করেছে।

সানা/আপ্র/৪/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

শান্তি আলোচনার আশায় বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম
২৯ অক্টোবর ২০২৬

শান্তি আলোচনার আশায় বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা আবার শুরুর সম...

ভোটের জটিল সমীকরণে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু
২৯ অক্টোবর ২০২৬

ভোটের জটিল সমীকরণে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেলেও আসনস...

স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ৬৮, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
২৯ অক্টোবর ২০২৬

স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ৬৮, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক

স্পেনের মধ্যাঞ্চলে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তিন...

৮৩ বছর বয়সে অবসর, আকাশে ৬৩ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবন
২৮ অক্টোবর ২০২৬

৮৩ বছর বয়সে অবসর, আকাশে ৬৩ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবন

যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এয়ারলাইনসের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সক্রিয় বিমানবালা ক্যারল ফেয়ার ৮৩ বছর বয়সে অবসরে গ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে