গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মেনু

কলকাতায় বদলে যাওয়া ঈদের আবহ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮:৪৪ পিএম, ২৯ মে ২০২৬ | আপডেট: ১৬:৩২ এএম ২০২৬
কলকাতায় বদলে যাওয়া ঈদের আবহ
ছবি

ঈদের দিন সকাল থেকেই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মুসল্লিদের সমাগম দেখা যায় -ছবি বিবিসি

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন বাস্তবতায় এবারের কোরবানির ঈদ উদযাপিত হয়েছে ভিন্ন পরিবেশে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত রেওয়াজ ভেঙে কলকাতার রেড রোডের পরিবর্তে এবার ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। একই সঙ্গে ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে কার্যকর, রাস্তায় নামাজে বিধিনিষেধ এবং কড়া পুলিশি নজরদারি—সব মিলিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল উদ্বেগ, শঙ্কা ও অস্বস্তির আবহ। খবর বিবিসি

ঈদের দিন সকাল থেকেই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মুসল্লিদের সমাগম দেখা যায়। তবে আগের বছরের তুলনায় উপস্থিতি ছিল কম। অনেকেই জানিয়েছেন, নতুন জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কোরবানি ঘিরে বিধিনিষেধের কারণে তারা পাড়ার মসজিদেই নামাজ আদায় করেছেন।

কলকাতার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার সঙ্গে রেড রোডে ঈদের নামাজ পড়তে যেতেন। তার ভাষায়, রেড রোডে ঈদের নামাজ যেন এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। যদিও ব্রিগেডে জায়গা বেশি এবং ভিড় সামলানো সহজ, তবু পুরোনো আবহ হারানোর আক্ষেপ ছিল অনেকের কণ্ঠে।

ঝাড়খণ্ড থেকে ২৫ বছর আগে কলকাতায় আসা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, রেড রোডের পরিবর্তে নতুন স্থানে ঈদের আয়োজনের খবর শুনে তার খারাপ লেগেছিল। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুকও। তবে তারা স্বীকার করেছেন, ব্রিগেডে জায়গা বেশি হওয়ায় নামাজ আদায়ে কিছু সুবিধা হয়েছে এবং যান চলাচলেও তেমন সমস্যা হয়নি।

গত বছর রেড রোডে ঈদের নামাজ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। কারণ এলাকা সেনাবাহিনীর অধীনে। পরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হস্তক্ষেপে অনুমতি মিলেছিল। তবে চলতি বছরে কলকাতা পুলিশ আয়োজক ‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’কে আগেই বিকল্প স্থান খুঁজতে বলে। পরে সেনাবাহিনীর অনুমতিতে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজন করা হয়।

ক্যালকাটা খিলাফত কমিটির পক্ষ থেকে মোহাম্মদ খলিল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রেড রোডে নামাজ হলেও এর আগে শহীদ মিনার সংলগ্ন মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হতো। তিনি জানান, এবার অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন নতুন জায়গায় সমস্যা হতে পারে কিংবা কোরবানি দিতে জটিলতা তৈরি হবে। ফলে অনেকে ঈদের সময় শহরের বাইরে চলে গেছেন।

চলতি বছরে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় নামাজ প্রায় দেখা যায়নি। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঈদের আগে কলকাতায় বিক্ষোভও হয়েছিল। নতুন সরকারের নির্দেশনায় রাস্তায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান সীমিত করা এবং প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করায় মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইনে গরু, মহিষ, ষাঁড় ও বলদ জবাইয়ের জন্য বয়স ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানায় পশু জবাই এবং প্রকাশ্যে কোরবানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়ে পশুর হাটেও। ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা জানিয়েছেন, ভীতি ও অনিশ্চয়তার কারণে এবার গরু বেচাকেনা কম হয়েছে।

কলকাতার উপকণ্ঠের ধুলাগড় পশুর হাটে এবারের চিত্র ছিল অনেকটাই ভিন্ন। ক্রেতাশূন্য হাটে ব্যবসায়ীরা লোকসানের আশঙ্কা নিয়ে বসে ছিলেন। একাধিক বিক্রেতা জানিয়েছেন, মানুষ ভয়ের কারণে গরু কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেক ব্যবসায়ী উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে পশু কিনলেও বিক্রি করতে পারেননি।

গরুর মাংসের ব্যবসাতেও প্রভাব পড়েছে। কলকাতার পরিচিত খাবারের দোকান ‘দ্য বার্গার শপ’ গরুর মাংসের বার্গার বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, “আমাদের বার্গারের কোনো ধর্ম নেই। কিন্তু রাজনীতির আছে।”

নিউমার্কেটের মাংস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসিম বলেন, কয়েক দশক ধরে ব্যবসা করলেও গত কয়েক সপ্তাহের মতো পরিস্থিতি তিনি আগে দেখেননি। সরবরাহকারী ও ক্রেতা—উভয় পক্ষের মধ্যেই ভীতি কাজ করছে বলে জানান তিনি।

ঈদের দিন কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন মসজিদের বাইরে কড়া পুলিশি নজরদারি ছিল। টিপু সুলতান মসজিদসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন দেখা গেছে। নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর বলেন, এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাকে বিস্মিত করেছে।

তবে পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও দেখছেন অনেকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার খলিল আহমেদ বলেন, এবারের ঈদের আয়োজন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিল। তার মতে, এই প্রথম ঈদের নামাজকে রাজনৈতিক বক্তব্যের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।

এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস আমলে রেড রোডের ঈদের মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেখান থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও দিতেন তিনি। তবে এবারের ব্রিগেডের জামাতে কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে দেখা যায়নি।

তপসিয়া এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এবারের ঈদ ছিল আরও ভিন্ন বাস্তবতার। সম্প্রতি একটি বহুতলে আগুন লাগার ঘটনায় প্রাণহানির পর প্রশাসন ভবন ভাঙার উদ্যোগ নেয়। আদালতের নির্দেশে ভাঙার কাজ স্থগিত হলেও বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে হয়। ঈদের দিন সেই এলাকায় অন্য বছরের তুলনায় ভিড়ও কম ছিল।

মোহাম্মদ জুনেইদ নামে এক দোকানদার বলেন, আগে এই এলাকায় ঈদের সময় প্রচুর ভিড় হতো, কিন্তু এবার পরিবেশ অনেকটাই নিস্তব্ধ। আরেক রিকশাচালক বলেন, পরিস্থিতি শান্ত হলেও যাদের মাথার ওপরের ছাদ হারিয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ধর্মীয় আচার, জনপরিসরে ধর্মীয় আয়োজন এবং গবাদিপশু জবাই সংক্রান্ত নীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এবারের ঈদ উদযাপনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা
সানা/আপ্র/২৯/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

একযোগে ৫৮ বিধায়কের বিদ্রোহে চরম সংকটে মমতার তৃণমূল
০৪ জুন ২০২৬

একযোগে ৫৮ বিধায়কের বিদ্রোহে চরম সংকটে মমতার তৃণমূল

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের পর এবার নজিরবিহীন ভাঙন ও সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে মমতা ব্যা...

শর্ত পূরণে ব্যর্থ, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
০৩ জুন ২০২৬

শর্ত পূরণে ব্যর্থ, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নতুন করে শুল...

হাদি হত্যার আসামিদের গ্রেফতার নিয়ে ‘চুপ থাকতে’ বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
০৩ জুন ২০২৬

হাদি হত্যার আসামিদের গ্রেফতার নিয়ে ‘চুপ থাকতে’ বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচিতে মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

এল নিনোর আশঙ্কা, আবহাওয়ার সতর্কবার্তা
০৩ জুন ২০২৬

এল নিনোর আশঙ্কা, আবহাওয়ার সতর্কবার্তা

বিশ্বজুড়ে খরা, দাবানল, অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে আবারো সক্রিয় হওয়ার পথে জলবায়ুর প্রাকৃতি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পদত্যাগ করলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান

বর্তমান সরকারের চারমাস পূর্ণ না হতেই হঠাৎ মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ালেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক এই পদত্যাগের পেছনে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি কি মনে করেন তিনি সত্যিই অসুস্থতার কারণে সরে গেলেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে