ভারতে প্রথমবারের মতো জন্মহার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তির ঘাটতি, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দ্রুত বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও আদমশুমারি কমিশনারের কার্যালয়ের সর্বশেষ নমুনা নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মোট প্রজনন হার বর্তমানে প্রতি নারীতে ১ দশমিক ৯ সন্তান। দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে যেখানে এই হার ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন, সেখানে ভারত এখন সেই সীমার নিচে অবস্থান করছে। ২০০০ সালের দিকে দেশটিতে এই হার ছিল প্রতি নারীতে প্রায় ৩ দশমিক ৩ সন্তান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার প্রসার, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সন্তান লালন-পালনের ব্যয় বৃদ্ধি জন্মহার কমার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে শিশু মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় পরিবারগুলো অতিরিক্ত সন্তান নেওয়ার প্রয়োজনও কম অনুভব করছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশু মৃত্যুর হার ছিল ৩০। ২০২৪ সালে তা কমে ২৪-এ নেমে এসেছে।
জন্মহারের ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। দরিদ্রতম রাজ্যগুলোর একটি বিহারে প্রজনন হার ২ দশমিক ৯, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে উত্তর প্রদেশ, যেখানে এই হার ২ দশমিক ৬।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার হার এবং তুলনামূলক উন্নত সামাজিক সূচকের কারণে রাজধানী নয়াদিল্লিতে জন্মহার সবচেয়ে কম, প্রতি নারীতে মাত্র ১ দশমিক ২ সন্তান। দক্ষিণের তামিলনাড়ু ও কেরালায় এ হার ১ দশমিক ৩।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দিপা সিনার মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নারীর সামাজিক অবস্থানের উন্নয়ন জন্মহার কমার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো কয়েক দশক ধরে এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকায় সেখানে জন্মহারও দ্রুত কমেছে।
শ্রমশক্তি সংকটের শঙ্কা: ২০০৫ সালে ভারত তথাকথিত ‘জনমিতিক সুবিধা’ পর্যায়ে প্রবেশ করে, যখন কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের হিসাবে, এই সুবিধা ২০৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং পরে চীন এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছিল। ভারতও এর সুফল পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জন্মহার আরো কমতে থাকলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং প্রবীণ মানুষের অনুপাত দ্রুত বাড়বে।
তাঁদের মতে, কয়েক দশক পর শ্রমবাজারে নতুন কর্মীর সংখ্যা কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।
রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ: জন্মহারের আঞ্চলিক বৈষম্য ভবিষ্যতে ভারতের রাজনৈতিক ও আর্থিক কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে তুলনামূলক বেশি জন্মহার থাকায় দেশটির মোট জনসংখ্যায় তাদের অংশ আরো বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় সম্পদ বণ্টন ও সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসকে ঘিরে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোর মধ্যে নতুন বিতর্ক দেখা দিতে পারে। আগামী আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে সংসদীয় আসন পুনর্র্নিধারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে মুসলমানদের জন্মহার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও সরকারি তথ্য বলছে, সব ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যেই জন্মহার দ্রুত কমছে। ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলমানদের প্রজনন হার ৪ দশমিক ৪১ থেকে ২ দশমিক ৩৬-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৯৪-এ কমেছে।
জন্মহার বাড়াতে উদ্যোগ: কেন্দ্রীয় সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো জাতীয় নীতি ঘোষণা না করলেও কয়েকটি রাজ্য জন্মহার বৃদ্ধিতে প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে।
দক্ষিণের অন্ধ্র প্রদেশ সরকার তৃতীয় সন্তান জন্মের জন্য ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য ৪০ হাজার রুপি প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রাজ্যটির বর্তমান জন্মহার ১ দশমিক ৪।
অন্যদিকে গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানা সরকার প্রথমবার সন্তান নিতে আগ্রহী দম্পতিদের জন্য সরকারি অর্থায়নে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মহার বাড়ানো বা কমানোর চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতের জনসংখ্যাগত বাস্তবতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত হওয়ার আগে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তাঁরা।
এশিয়াজুড়েই একই সংকট: ভারত একা নয়; এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশ দ্রুত কমতে থাকা জন্মহারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রজনন হার বর্তমানে ১ দশমিক ০। তাইওয়ানে এ হার প্রায় ০ দশমিক ৮৬।
অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্য বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি নারীতে জন্মহার প্রায় ০ দশমিক ৭৫, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন। সূত্র: আল-জাজিরা
সানা/আপ্র/১০/৬/২০২৬