কোনো কাজে কিংবা একটু আড়াল হলেই মা-বাবা সন্তানদের নিয়ে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। বৃদ্ধ মা হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন, বাবা বারবার ফোন করে সন্তানের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওপাশ থেকে ফোন কেটে যায় বারবার। সন্তান যেন গভীরভাবে ব্যস্ত। অথচ যে সন্তানকে বড় করতে মা-বাবা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এক করে দিয়েছেন, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু সন্তানের পেছনে উৎসর্গ করেছেন, সেই সন্তানের জীবনে আজ তাদের জন্য সময়টুকু কোথায়? একই সময়ে সেই সন্তান হয়তো বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী কিংবা অন্যদের জন্য সময় বের করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, ঘুরতে যাচ্ছেন, সামাজিক নানা কাজে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু মা-বাবার জন্য সময় বের করতে গেলেই ব্যস্ততার কথা সামনে চলে আসছে।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, সন্তানের শৈশবে এই বাবা-মা নিজের ঘুম, নিজের জন্য সময়, অর্থ, স্বাচ্ছন্দ্য- সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। একটাই উদ্দেশ্য ছিল, সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করা, তাকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলা। সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন সুন্দর হয়, সে যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সেই চিন্তাতেই কেটে গেছে তাদের জীবনের অনেকটা সময়। কিন্তু সন্তান যখন বড় হয়ে যায়, তখন তার জীবনে চাকরি, ব্যবসা, সংসার, সামাজিক জীবন, বন্ধুবান্ধব, নানা দায়িত্ব এসে জায়গা করে নেয়। সময় ভাগ হয়ে যায় অনেক দিকে। সেখানেই একটা প্রশ্ন থেকে যায়। ব্যস্ততা কি সত্যিই এত বেশি, নাকি অগ্রাধিকারের তালিকায় বাবা-মা একটু একটু করে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছেন? সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু বাহ্যিক দূরত্বই তৈরি হয় না, অনেক সময় একই বাড়িতে থেকেও দূরত্ব তৈরি হয়। একই ছাদের নিচে থেকেও বাবা-মা একাকী অনুভব করেন। বাবা-মায়ের হয়তো ওষুধ দরকার, একটু সেবা দরকার, একটু পাশে বসা দরকার। কিন্তু সন্তান নিজের ব্যস্ততার কথা বলে, মা কিংবা বাবাকে জানায়, পরে দেখছি, পরে করছি। এই পরে শব্দটিই কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস হয়ে দাঁড়ায়। যখন তারা আর পৃথিবীতে থাকবেন না।
প্রশ্ন হতে পারে, বৃদ্ধ মা-বাবার আসলে কী দরকার? সন্তানের কাছ থেকে তাদের প্রত্যাশাই বা কতটুকু? অনেক সময় তাদের বড় কিছুই চাওয়ার থাকে না। তারা হয়তো শুধু একটু কথা বলতে চায়। দিনের গল্প বলতে চায়। সন্তানের সঙ্গে এক কাপ চা খেতে চায়। ডাক্তার দেখাতে গেলে পাশে কাউকে চায়। নাতি নাতনির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চায়। কখনো হয়তো শুধু শুনতে চায়, তুমি কেমন আছো? এই ছোট ছোট চাওয়াগুলোই অনেক সময় তাদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া হয়ে ওঠে। অনেক সন্তান বাবা মায়ের সেবা বলতে দূর থেকে তাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাঠানোকে বোঝেন। নিঃসন্দেহে মা-বাবার প্রয়োজন মেটাতে অর্থের প্রয়োজন আছে। আপনি দূরে থাকেন, হয়তো নিয়মিত তাদের খরচ পাঠান, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এগুলোও দায়িত্বের অংশ। কিন্তু দূরে থেকেও তাদের জন্য সময় এবং মনোযোগ রাখা যে এক ধরনের যত্ন, সেটিও আমাদের মনে রাখতে হবে। অনেকে মনে করেন, মা-বাবার ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, একজন পরিচর্যাকারী রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু নিশ্চিত করাই দায়িত্ব পালন। কিন্তু তাদের প্রয়োজন মেটানো আর প্রয়োজনের সময়ে সন্তানকে পাশে পাওয়া, দুটো এক বিষয় নয়। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের খরচ হয়তো মেটানো যায়। চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা করা যায়। প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে দেওয়া যায়। কিন্তু তাদের নিঃসঙ্গতার ওষুধ কী? সেই ওষুধ অনেক সময় সন্তানের উপস্থিতি। একটু পাশে বসা। কয়েক মিনিট কথা বলা। তাদের কথা মন দিয়ে শোনা। পুরোনো কোনো গল্প আবারও শুনে হাসা। একসঙ্গে চা খাওয়া। এসবের জন্য খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় শুধু একটু সময় এবং আন্তরিকতার।
অবশ্য বাস্তবতাকেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, দূরের শহরে থাকা, বিদেশে থাকা, নিজের সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব, মানসিক চাপ, জীবনের নানা ব্যস্ততা সবকিছু মিলিয়ে অনেক সন্তানের পক্ষেই মা-বাবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা সম্ভব হয় না। এটিও বাস্তবতা। কিন্তু একেবারেই সময় বের করা যায় না, সেটিও সব সময় সত্য নয়। প্রতিদিন দশ মিনিট সময় করে বাবা-মাকে ফোন দেওয়া যায়। সপ্তাহে অন্তত একদিন একটু দীর্ঘ সময় কথা বলা যায়। সুযোগ হলে দেখা করা যায়। তাদের প্রয়োজনের কথা নিজে থেকে জানতে চাওয়া যায়। ছোট ছোট এই বিষয়গুলোই মা-বাবা-র মনে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিতে পারে। আমরা প্রায়ই বলি, এই কাজটা শেষ করি, তারপর মা-বাবাকে সময় দেব। ক্যারিয়ারটা একটু গুছিয়ে নিই, তারপর তাদের সঙ্গে সময় কাটাব। ছুটিতে গিয়ে অনেকটা সময় একসঙ্গে থাকব। কিন্তু বাবা মায়ের বয়স অপেক্ষা করে না। একদিন হয়তো সত্যিই আপনার হাতে অনেক সময় থাকবে। কাজের চাপ কমবে। ছুটি হবে। জীবনে অনেক কিছু গুছিয়ে যাবে। কিন্তু সেই সময়টুকু উপভোগ করার জন্য বাবা কিংবা মা হয়তো আর থাকবেন না। সেদিন আপনার সাফল্য থাকবে, অর্থ থাকবে, পরিচিতি থাকবে, জীবনের অনেক অর্জন থাকবে। কিন্তু তার মাঝেও একটা বিশাল অপূর্ণতা থেকে যাবে। মনে হবে, আর একটু সময় যদি দিতাম। আর একটু পাশে যদি থাকতাম। আর কয়েকটা কথা যদি বলা হতো। কিন্তু তখন চাইলেও সেই সময় আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আমরা মা-বাবা জন্য কত টাকা খরচ করছি, কতবার চিকিৎসার বিল দিচ্ছি, কত কিছু কিনে দিচ্ছি- তার হিসাব হয়তো রাখি। প্রয়োজন হলে সেই হিসাব দেখাতেও পারি। কিন্তু গত একমাসে মা-বাবার সঙ্গে কতটা মন দিয়ে কথা বলেছি, কতবার তাদের কেমন আছেন জিজ্ঞেস করেছি, কতটা সময় তাদের পাশে বসেছি, তাদের মনের কথা জানার কতটা চেষ্টা করেছি, সেই হিসাব কি আমরা রাখি? এই হিসাবটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ বাবা-মায়ের প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়। তাদের প্রয়োজন নিরাপত্তা, সঙ্গ, ভালোবাসা এবং সন্তানের উপস্থিতির অনুভূতি।
সন্তানকে বড় করতে মা-বাবা নিজেদের জীবনের যে সময়টুকু দিয়েছেন, তার বিনিময়ে সন্তানকে একইভাবে সবকিছু ফিরিয়ে দিতে হবে, এমন কোনো হিসাব নেই। মা-বাবার ভালোবাসার মূল্য কখনো শোধ করা যায় না। কিন্তু তাদের বৃদ্ধ বয়সে পাশে থাকা, তাদের প্রয়োজনের সময়ে এগিয়ে আসা এবং তাদের একাকিত্বকে একটু হলেও কমিয়ে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই সময় থাকতে মা-বাবার যত্ন নেওয়া দরকার। সময় থাকতে তাদের পাশে থাকুন। হয়তো আপনার কাছে সেটি কয়েক মিনিটের একটি ফোনকল, এক কাপ চা কিংবা কিছুক্ষণ পাশে বসে থাকা। কিন্তু একজন বৃদ্ধ বাবা কিংবা মায়ের কাছে সেটিই হতে পারে দিনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬