বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের আর্থিক লেনদেনকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে আগামী ১ নভেম্বর থেকে ‘বাংলা কিউআর’-এর চতুর্থ ধাপ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে কিউআর কোড ব্যবহার করে সরাসরি অর্থ আদান-প্রদানের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। এতে রিকশাচালক, বাসের কন্ডাক্টর, হকার, সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে সাহায্যপ্রার্থীরাও ব্যক্তিগত কিউআর কোডের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন।
নতুন ব্যবস্থায় লেনদেনের জন্য বাণিজ্যিক মার্চেন্ট হিসাবের প্রয়োজন হবে না। একটি মুঠোফোনের আর্থিক সেবা বা ব্যাংকিং অ্যাপ থেকে অন্য অ্যাপে কিউআর কোড স্ক্যান করে সরাসরি টাকা পাঠানো যাবে।
প্রযুক্তি খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গুগল, মেটা ও হুয়াওয়ের প্রতিনিধিরাও বাংলা কিউআরের এ উন্মুক্ত মডেল নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র লেনদেনেও ডিজিটাল প্রযুক্তি
এত দিন বড় বিপণিবিতান ও শপিং মলে কেনাকাটার বিল পরিশোধে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বেশি দেখা যেত। তবে সমাজের প্রান্তিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষকে যুক্ত করা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাংলা কিউআরের চতুর্থ ধাপের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র লেনদেনও ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ব্যবস্থায় বাসের ভাড়া, রাস্তার পাশের দোকানে পাঁচ টাকার চা, ফুটপাতের ভ্যান থেকে ১০ টাকার কাঁচামরিচ বা ধনেপাতা কেনা, জুতা সেলাইয়ের ২০ টাকা কিংবা সেলুনের বিল পরিশোধ করা যাবে কিউআর কোড স্ক্যান করে। ফলে পকেটে নগদ টাকা না রেখেও একজন নাগরিক দৈনন্দিন খরচ মেটাতে পারবেন।
ভাংতি ও ছেঁড়া নোটের ঝামেলা কমবে
রিকশা ও বাসের ভাড়া কিংবা চায়ের দোকানে কেনাকাটার সময় খুচরা টাকার অভাবে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রেতা ভাংতি দিতে পারেন না, আবার কখনো অতিরিক্ত টাকা রেখে দেন। বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পাঠানো সম্ভব হওয়ায় এ সমস্যা কমতে পারে।
বিল ২৩ বা ৪৭ টাকা হলেও ক্রেতাকে পূর্ণ অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে হবে না। অ্যাপের মাধ্যমে ঠিক যত টাকা প্রয়োজন, ততটাই পাঠানো যাবে। এতে দুই বা তিন টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার ঝামেলা কমবে। একই সঙ্গে ছেঁড়া ও নোংরা নোটের ব্যবহারজনিত বিড়ম্বনাও এড়ানো সম্ভব হবে।
ডিজিটাল মাধ্যমে দান ও সাহায্য
নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে দান-খয়রাত ও সাহায্যের অর্থও ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেওয়া যাবে। রাস্তায় কিংবা ধর্মীয় উপাসনালয়ের সামনে সাহায্যপ্রার্থী বা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর কোড প্রদর্শন করতে পারবে। সাহায্যকারী দুই, পাঁচ বা ১০ টাকার মতো ছোট অঙ্কও সরাসরি পাঠাতে পারবেন।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তিগত কিউআর কোড শুধু বৈধ অর্থ লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা যাবে। অননুমোদিতভাবে টাকা তোলার মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যাপে সহজে মিলবে কিউআর সুবিধা
গ্রাহকদের লেনদেন সহজ করতে ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপের নকশায় পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অ্যাপের মূল পাতার নিচের দিকে, সহজে ব্যবহার করা যায় এমন স্থানে ‘বাংলা কিউআর’ আইকন রাখার নির্দেশনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যক্তিগত হিসাবের ক্ষেত্রে আগে দৈনিক ২০ হাজার টাকার যে লেনদেনসীমা ছিল, তা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সীমার বাধা ছাড়াই অর্থ আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হবে। সরাসরি কিউআর কোড স্ক্যান করার পাশাপাশি মুঠোফোনের গ্যালারিতে থাকা কোডের ছবি বা পর্দার ছবিও অ্যাপে যুক্ত করে লেনদেন সম্পন্ন করার সুবিধা চালুর কথা বলা হয়েছে।
লেনদেনে মাশুল না রাখার পরিকল্পনা
ডিজিটাল লেনদেনে অতিরিক্ত মাশুলের আশঙ্কা অনেক গ্রাহকের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ বাধা কমাতে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনে গ্রাহক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের জন্যই মাশুল শূন্য রাখার সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ হিসাবে রিকশাচালককে ৩০ টাকা ভাড়া পাঠালে গ্রাহকের হিসাব থেকে অতিরিক্ত অর্থ কাটা হবে না এবং চালকও পুরো ৩০ টাকা পাবেন। পাশাপাশি অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপকের হিসাবে জমা হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দৈনিক লেনদেন বেড়েছে কয়েক গুণ
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গত জুনে বাংলা কিউআরে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৩৭ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দৈনিক গড়ে ১৪৩ কোটি থেকে ১৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ চার গুণেরও বেশি হয়েছে।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর চালু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দ্রুত ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা।
নিরাপদ লেনদেনে সতর্কতা জরুরি
বাংলা কিউআর আন্তর্জাতিক ইএমভি মান অনুসরণ করে তৈরি হওয়ায় প্রযুক্তিগতভাবে নিরাপদ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে লেনদেনের সময় ব্যবহারকারীদের কিছু সতর্কতা মেনে চলতে হবে।
কিউআর কোড স্ক্যান করার পর টাকা পাঠানোর আগে অ্যাপের পর্দায় প্রদর্শিত প্রাপক বা বিক্রেতার নাম মিলিয়ে নিতে হবে। অন্যদিকে, বিক্রেতা বা রিকশাচালকদের শুধু গ্রাহকের মুঠোফোনের পর্দায় লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার দৃশ্য দেখে নিশ্চিত হওয়া উচিত নয়। নিজেদের ফোনে আসা নিশ্চিতকরণ বার্তা বা অ্যাপের হিসাব পরীক্ষা করে অর্থ জমা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্ষুদ্র লেনদেনকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনার এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রিকশাভাড়া, ছোটখাটো কেনাকাটা ও দান-খয়রাতের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে পরিকল্পিত এ সম্প্রসারণ বাংলাদেশের নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার একটি নতুন ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এসি/আপ্র/১২/১০/২০২৬