আর মাত্র একদিন পর ঈদুল আজহা। দেশের নানা প্রান্তে যখন কোরবানির প্রস্তুতি, নতুন পোশাক, বাজার-সদাই আর পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগির ব্যস্ততা, তখন রাজধানীর কালশীর বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে ঈদ এসেছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে।
চারদিকে এখনও পোড়া গন্ধ। কালো ছাইয়ের স্তূপে মিশে আছে মানুষের বহু বছরের সঞ্চয়, স্মৃতি আর বেঁচে থাকার লড়াই। কোথাও পোড়া টিন, কোথাও আধপোড়া কাপড়, কোথাও ভস্মীভূত বিছানা কিংবা রান্নার হাঁড়ি। আগুন শুধু ঘর পোড়ায়নি, কেড়ে নিয়েছে শত শত মানুষের ঈদের আনন্দ, নিরাপত্তা আর আগামী দিনের স্বপ্ন।
গতকাল সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটের দিকে রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ফায়ার সার্ভিসের একের পর এক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় ১৫টি ইউনিট রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিক হিসাবে শতাধিক ঘর ও দোকানপাট পুড়ে গেছে।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের বাজারের ব্যাগ নয়, মানুষের হাতে এখন ভাঙা টিন আর পোড়া কাঠের টুকরো। কেউ ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে হারানো জিনিস খুঁজছেন, কেউ আবার যা অবশিষ্ট আছে, তা বিক্রি করে নতুন করে বাঁচার সামান্য পুঁজি জোগাড়ের চেষ্টা করছেন।
সাত বছর ধরে বস্তিটিতে বসবাস করা বকুলা বেগমের চোখে তখনও শুকায়নি কান্না। আগুনে পুড়ে গেছে তাঁর দুটি ঘর। নয়জন সদস্যের পরিবার নিয়ে এখন তিনি খোলা আকাশের নিচে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ঈদের সময় বাসায় বাসায় গিয়ে মাংস টুকাই, ওই মাংস দিয়াই দুই দিন ভালো খাই। এবার তো সব শেষ। মাংস আনলেও রান্না করমু কই? মাথার ওপরে ছাদ নাই। এবারের ঈদ আমাগো আসমানের নিচে।”
বকুলা বেগমের মতো আরও শত শত মানুষের ঈদের গল্প এখন একই রকম। কারও ঘর নেই, কারও দোকান নেই, কারও বহু বছরের সঞ্চয় নেই।
বস্তির বাসিন্দা মো. নবাবের কণ্ঠে ছিল হতাশা আর অসহায়ত্বের মিশ্র প্রতিধ্বনি। আগুনে তাঁর ১৫টি ঘর এবং একটি মুদি দোকান পুড়ে গেছে।
তিনি বলেন, “এই শহরে ২০ বছর ধইরা যা কামাইছি, সব এক আগুনে শেষ। দোকানে কয়েক লাখ টাকার মাল ছিল। কিছুই বাঁচাইতে পারি নাই। আজ গরু আনার কথা ছিল, এখন থাকার জায়গাই নাই।”
কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন শাহীন আলম। ভাঙারির দোকানে কাজ করে সংসার চালান। সমিতি থেকে কিস্তিতে টাকা তুলে ঈদের পর একটি রিকশা কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নও পুড়ে গেছে আগুনে।
ঘরের মালামালের সঙ্গে তাঁর ৪২ হাজার টাকাও ভস্মীভূত হয়েছে।
“ভাবছিলাম নিজের একটা রিকশা হইবো। আর অন্যের দোকানে কাজ করতে হইবো না। এখন টাকাও নাই, ঘরও নাই। মানুষ ঈদ করবো, আর আমরা ভাবতেছি রাতটা কোথায় কাটামু”—বলছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিজেদের মতো করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করেছে। কেউ পোড়া টিন খুলছেন, কেউ ভাঙা কাঠ সংগ্রহ করছেন। সেসব পরে বিক্রি হবে ভাঙারির দোকানে। সেই টাকাই হয়তো হবে নতুন করে ঘর তোলার প্রথম পুঁজি।
মোহাম্মদ সবুজের ১১টি ঘর পুড়ে গেছে। তারপরও হাল ছাড়েননি।
তিনি বলেন, “যা পাই, তা দিয়াই আবার শুরু করতে হইবো। গরিব মানুষের জীবনই এই রকম। পড়ে যাই, আবার উঠি।”
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই। ঈদের আগের রাতে শত শত পরিবার খোলা আকাশের নিচে। শিশুদের চোখে ভয়, নারীদের চোখে অনিশ্চয়তা, আর পুরুষদের মুখে আগামী দিনের হিসাব।
স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, আগুনের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হয়তো একদিন কাগজে লেখা যাবে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, স্মৃতি আর নিরাপত্তাবোধের মূল্য কোনো সংখ্যায় মাপা সম্ভব নয়।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাণ নির্ধারণে তদন্ত করা হবে।
তবে কালশীর বাউনিয়াবাঁধ বস্তির মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—ঈদের সকালে তারা কোথায় জেগে উঠবেন?
যে ঘরে ঈদের রান্না হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু ছাই। যে উঠোনে শিশুদের হাসির শব্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। আর যে উৎসব মানুষকে একত্র করে, সেই ঈদের আগেই আগুন তাদের কেড়ে নিয়েছে মাথার ওপরের শেষ আশ্রয়টুকু।
সানা/আপ্র/২৬/৫/২০২৬