তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বকে আরো গভীর ও বিস্তৃত পর্যায়ে উন্নীত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতায় সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আঙ্কারা। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য পথ অনুসন্ধানের কথাও জানিয়েছে দেশটি।
বৈঠক ও যৌথ অবস্থান: শুক্রবার (৫ জুন) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং পরবর্তীতে একান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে নির্ধারিত কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি না থাকলেও দুই দেশের সম্পর্ক, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তবে কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি।
প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য সহযোগিতা: তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরো শক্তিশালী ও ভবিষ্যতমুখী পর্যায়ে নিয়ে যেতে দুই দেশ কাজ করছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তিনি জানান, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বস্ত্র ও পোশাক, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতে তুর্কি বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে একটি পৃথক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও তুরস্কের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতা: দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রত্নসম্পদ রক্ষা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, মহাফেজখানা ও গ্রন্থাগার সংরক্ষণ, ডিজিটাল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগিতা আরো জোরদার হবে।
এছাড়া একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংস্থার ১৯৭০ সালের নীতিমালার আলোকে অবৈধভাবে সাংস্কৃতিক সম্পদ স্থানান্তর প্রতিরোধেও যৌথভাবে কাজ করবে দুই দেশ।
রোহিঙ্গা ও আঞ্চলিক ইস্যু: তুরস্ক রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচ্যসূচিতে রাখতে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে। মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠকে আঞ্চলিক সংঘাত ও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা হয়। বিশেষ করে ইরান অঞ্চলের পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মত দেয় তুরস্ক। সংকট সমাধানে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বন্ধু, অংশীদার, প্রভু নয়: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে কেন্দ্র করে গঠিত। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই এই নীতির মূল লক্ষ্য। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বাইরে রয়েছে বন্ধু ও অংশীদার, কিন্তু কোনো প্রভু নেই। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবিক সহযোগিতা: বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রস্তাব তুরস্কের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। বর্তমানে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি তুরস্কে অবস্থান করছেন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী।
বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা: তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। তিনি সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি আরো বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও তুরস্ক যৌথভাবে কাজ করে যাবে।
শেষ পর্যায়ে মন্তব্য: দুই দেশের পক্ষ থেকে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয় তুরস্কের পক্ষ থেকে।
সানা/আপ্র/৫/৬/২০২৬