ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন। রোববার (৭ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনে এই অধিবেশন শুরু হয়।
অধিবেশনে আগামী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এর আগে, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গত ৭ মে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদের এ অধিবেশন আহ্বান করেন।
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করেছে সরকার। বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা, ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় বৃদ্ধি, সুদ পরিশোধের চাপ এবং সরকারি কর্মচারীদের প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়নের কারণে ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
বাজেটে পে-স্কেল নিয়ে বড় পরিকল্পনা: মূলত, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতিকে বাজেটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
উল্লেখ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার, যা পরে সংশোধিত হয়ে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। সে সময় উন্নয়ন খরচ কমিয়ে ভর্তুকি ও অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হয়েছিল। সেই হিসাবে বিএনপি সরকারের আসন্ন বাজেট চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হতে যাচ্ছে। অতীতে সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হতো।
তোফায়েল ও মোশাররফসহ মন্ত্রী-এমপিদের মৃত্যুতে সংসদে শোক: মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে জাতীয় সংসদ।
রোববার (৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে তা সংসদে গৃহীত হয়।
প্রয়াত ব্যক্তিদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন সংসদ সদস্যরা। পরে মোনাজাত করেন সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান।
শোক প্রস্তাবে আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও মোশাররফ হোসেনের নামও ছিল। শোক জানানো হয় আওয়ামী লীগের আরেক নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম রহমত উল্লাহ, দবিরুল ইসলাম, এ বি এম আনোয়ারুল হক ও মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুতেও।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী শফিক আহমেদ এবং দশম সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবদুল মতিনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে সংসদ।
বিএনপি সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা, অধ্যাপক এম এ মান্নান, সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান শামসুল আবেদীন, জি এম ফজলুল হক, জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মো. কায়সার, আবু নূর মোহাম্মদ বাহাউল হক ও গোলাম সারোয়ার মিলন এবং সিপিবির সাবেক সংসদ সদস্য মো. সামসুদ্দোহার মৃত্যুতেও শোক জানানো হয়।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের স্ত্রী অধ্যাপক দিলোারা হাফিজের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে জাতীয় সংসদ।
শোক প্রস্তাবে জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ, কবি হেলাল হাফিজ, ছায়ানটের সভাপতি সনজীদা খাতুন, সংগীতশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী, লেখক বদরুদ্দীন উমর, নজরুল সংগীতশিল্পী ডালিয়া নওশীন, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা আব্দুল কুদ্দুস, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের মা বেগম জেবুন্নেছা, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবু, সংঘরাজ ড. জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির এবং সাংবাদিক গাজী রুহুল আমিনের মৃত্যুতেও শোক জানানো হয়।
ধর্ষণের পর হত্যার শিকার মিরপুরের শিশু রামিসা, চট্টগ্রামের ফাহিমা মিম, নরসিংদীর আমিনা ও তাবাসসুম আক্তারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে জাতীয় সংসদ।
প্রয়াত মন্ত্রী-এমপি ও বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে রোববার জাতীয় সংসদে মোনাজাত করেন সদস্যরা।
শোকপ্রস্তাবে তোফায়েলের রাজনৈতিক জীবন: তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে গৃহীত শোক প্রস্তাবে বলা হয়, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তোফায়েল আহমেদ উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।
প্রস্তাবে আরো বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং একাধিকবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি নবম জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং দশম জাতীয় সংসদে কার্য উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন।
শোক প্রস্তাবে বলা হয়, “বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশ একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজসেবককে হারালো। এ সংসদ তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ, বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করছে।”
শোক প্রস্তাবের একটি অনুলিপি তোফায়েল আহমেদের পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হবে বলেও জানানো হয়।
সংসদের রীতি অনুযায়ী, অধিবেশনের প্রথম দিনে প্রয়াত মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর জুন মাসে জাতীয় বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য সংসদ অধিবেশন বসে, যা বাজেট অধিবেশন হিসেবে পরিচিত। আসন্ন অধিবেশনে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিফলন হিসেবে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে এবং এর ওপর সংসদ সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনায় অংশ নেবেন। এর আগে গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। যা শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল।
সানা/আপ্র/৭/৬/২০২৬