পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তে নারী-শিশুসহ ২১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কয়েক দিন শূন্যরেখায় আটকে থাকা ব্যক্তিদের অবশেষে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কঠোর অবস্থান ও নজরদারির মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় গত শুক্রবার (৫ জুন) ভোরে। তবে বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা সীমান্ত অতিক্রম করতে ব্যর্থ হন। এরপর নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ওই ১০ জন শূন্যরেখার ফসলি জমির সরু আলে অবস্থান করতে বাধ্য হন। দীর্ঘ প্রায় ৬৯ ঘণ্টা রোদ, বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির মধ্যে মানবেতর পরিস্থিতিতে থাকার পর রোববার দিবাগত রাত ২টা ৪০ মিনিটে সীমান্তের নিরাপত্তা বাতি বন্ধ করে তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ।
ওই ১০ জনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী ও তিনটি শিশু ছিল। ঘটনাটি নিয়ে শনিবার (৬ জুন) বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও ভারতের ৯৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মধ্যে কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়েও বৈঠক হলেও সমাধান হয়নি।
হাড়িভাসা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হাসিবুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির মধ্যেও নারী ও শিশুসহ লোকগুলো শূন্যরেখায় অবস্থান করছিল। তিন দিন ধরে তাদের দুর্ভোগ স্থানীয়দেরও নাড়া দিয়েছে।
নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, রাত ২টা ৪০ মিনিটে বিএসএফ ওই ১০ জনকে নিজেদের দিকে ফিরিয়ে নেয়। সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবির নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
একই ধরনের ঘটনা ঘটে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তেও। গত শুক্রবার (৫ জুন) দিবাগত রাতে ৩৪৯ নম্বর প্রধান পিলারের ৭ নম্বর উপপিলারসংলগ্ন এলাকায় তিন পুরুষ, চার নারী ও চার শিশুসহ ১১ জনকে শূন্যরেখার দিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দিলে তারা ভারতীয় অংশের শূন্যরেখায় অবস্থান করতে থাকে।
ঘটনাটি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে দুই দফা পতাকা বৈঠক হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে সোমবার ভোররাত সাড়ে ৩টার পর বিএসএফ ওই ১১ জনকে শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়।
দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সীমান্তে বিজিবির টহল ও নজরদারি আরো জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পুশইনের অভিযোগ ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে সরকার। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্তে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সীমান্তবর্তী ১১ জেলায় আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপপরিচালক (গণসংযোগ) মো. আশিকউজ্জামান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, ২০২৫ সালে বিজিবির সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় সীমান্ত এলাকায় আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কার্যক্রম আরো সমন্বিত ও কার্যকর হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ও নিরাপত্তাগত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আনসার-ভিডিপি সদস্যরা বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী যেসব জেলায় আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে সেগুলো হলো- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর ও খাগড়াছড়ি।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে পুশ ইনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলেও বাংলাদেশের অবস্থান হলো- যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এবং যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রচলিত কূটনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে।
সূত্র: বিজিবি, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন।
সানা/আপ্র/৮/৬/২০২৬