গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

মেনু

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদীর জীবনাবসান, বাংলা কবিতার প্রাজ্ঞ কণ্ঠের বিদায়

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬:৩৫ পিএম, ১৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১৮:১৮ এএম ২০২৬
একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদীর জীবনাবসান, বাংলা কবিতার প্রাজ্ঞ কণ্ঠের বিদায়
ছবি

কবি আল মুজাহিদী -ছবি সংগৃহীত

বাংলা কবিতার আকাশ থেকে ঝরে পড়ল আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, গবেষক, সম্পাদক ও দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক আল মুজাহিদী আর নেই। দীর্ঘ সাহিত্যসাধনা, সাংবাদিকতা ও মননশীল সৃজনযাত্রার অবসান ঘটিয়ে রাজধানীর গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৯ জুন) তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

কবির প্রস্থান শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। কবিতা, গবেষণা, অনুবাদ, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও শিশুসাহিত্যে সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করা এই সৃষ্টিশীল মানুষটি কয়েক দশক ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও চিন্তার গভীরতায়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। রক্তে সংক্রমণ, কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রের জটিলতাসহ একাধিক শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। গত ১৫ জুন তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন থেকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েক দফা হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটের দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

কবির মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী জানান, প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন তাঁর বাবা। হৃদ্যন্ত্রে দুবার রিং পরানো হয়েছিল। গত বছর চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। কিডনির সমস্যাও জটিল আকার ধারণ করে। চলতি বছরের এপ্রিল ও জুন মাসে একাধিকবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল মুজাহিদী। তাঁর বাবা আবদুল হালিম জামালী ছিলেন নাট্যকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। মা সাখিনা খান ছিলেন গীতিকার ও সমাজকর্মী। শৈশব থেকেই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার আবহে বেড়ে ওঠা আল মুজাহিদীর মনন গড়ে ওঠে এক স্বতন্ত্র মানবিক ও দেশপ্রেমিক বোধে।

টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পৃথকভাবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সমাজবিজ্ঞান ও সাহিত্য-এই দুই ধারার জ্ঞান তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।

ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আল মুজাহিদী বিশেষভাবে সমাদৃত। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে বারবার উঠে এসেছে স্বাধীনতার আকাঙক্ষা, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, মাটির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং জাতিসত্তার প্রশ্ন।

আধুনিক কাব্যরীতির সঙ্গে লোকজ ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন নিজস্ব কাব্যভাষা। মৃত্তিকা, প্রকৃতি, প্রেম, ইতিহাস, জাতীয় চেতনা, পৌরাণিক অনুষঙ্গ ও আত্মদর্শন তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। সমাজবিজ্ঞানে গভীর দখলের কারণে নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহ্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানও তাঁর কবিতায় পেয়েছে স্বাভাবিক ও শিল্পিত উপস্থিতি।

আল মুজাহিদীর কবিতা সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান একসময় বলেছিলেন, তিনি প্রাচীন গ্রিক কাব্যের মৃত্তিকাবোধের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’ থেকেই সেই জীবনদর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। আকাশ, নক্ষত্র ও নীহারিকার বিস্তৃত কল্পলোকের মধ্যেও তিনি কখনো মাটির মানুষের জীবন ও বাস্তবতাকে ভুলে যাননি।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘দূত পারাবত’, ‘মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা’, ‘সমুদ্র মেখলা’, ‘কালের বন্দিশে’, ‘যুদ্ধ নাস্তি’, ‘ঈভের হ্যামলেট’, ‘প্রাচ্য পৃথিবী’, ‘পৃথিবীর ধুলো’, ‘সৌর জোনাকি’, ‘ভিতা নুওভা’, ‘অ্যাকাডেমাসের বাগান’, ‘সন্ধ্যার বৃষ্টি’ এবং ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’।

কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদ সাহিত্যেও তিনি রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। শিশু-কিশোরদের জন্যও রচনা করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গ্রন্থ। বাংলা ভাষার পাঠকসমাজের কাছে তিনি ছিলেন এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা।

পেশাজীবনে তিন দশকেরও বেশি সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আল মুজাহিদী। তাঁর সম্পাদনায় সাহিত্যপাতা হয়ে উঠেছিল নবীন ও প্রবীণ লেখকদের সৃজনচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। পরবর্তীকালে যায়যায়দিন পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ষান্মাসিক সাহিত্যপত্র ‘নতুন এক মাত্রা’।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৩ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার, জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা লাভ করেন।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী পলিন পারভীন, ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী, মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আল মুজাহিদীর বিদায়ে বাংলা সাহিত্য হারালো এক নিবেদিতপ্রাণ সাধককে। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিমালা, মাটির গন্ধমাখা কাব্যভাষা, মানবিক চেতনা ও মননশীল সৃষ্টিকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে প্রেরণার উৎস। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রকৃত কবিরা তাঁদের শব্দের ভেতর দিয়েই বেঁচে থাকেন-আল মুজাহিদীও তেমনি বেঁচে থাকবেন বাংলা কবিতার ইতিহাসে, পাঠকের হৃদয়ে এবং বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে।
সানা/আপ্র/১৯/৬/২০২৬ 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ঢাকাসহ ৮ বিভাগে ১০ দিন ঝড়-বৃষ্টির আভাস
১৯ জুন ২০২৬

ঢাকাসহ ৮ বিভাগে ১০ দিন ঝড়-বৃষ্টির আভাস

ঢাকাসহ দেশের ৮ বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে আগামী ১০ দিন ঝড় ও বৃষ্টি হতে পারে আভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়...

মণিপুরে ভূকম্পন, কাঁপলো দেশের বিভিন্ন এলাকা
১৯ জুন ২০২৬

মণিপুরে ভূকম্পন, কাঁপলো দেশের বিভিন্ন এলাকা

দেশের বিভিন্ন স্থানে আবারও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাত ৯টা ২৯ মিনিটে এই ভূমিকম্প...

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে ৪১ গুণ
১৮ জুন ২০২৬

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ বেড়েছে ৪১ গুণ

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায়। যার মধ্যে ২০২৫ সালে জমা হয়ে...

সংসদ সদস্যদের কেউ ঋণখেলাপি নন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
১৮ জুন ২০২৬

সংসদ সদস্যদের কেউ ঋণখেলাপি নন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংসদ সদস্যদের কেউ ঋণখেলাপি নন, কেউ কেউ হয়তো ঋণগ্রস্ত হতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

মেসিই সর্বকালের সেরা, বললেন রোনালদো

আর কোনো বিতর্ক নয়, কোনো লুকোছাপাও নয়—লিওনেল মেসিকেই সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিও। আপনি কি রোনালদোর কথায় একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে