দেশি-বিদেশি ২০ জনকে হত্যার মধ্য দিয়ে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া গুলশানের হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক পূর্ণ হলো। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতের সেই নৃশংস জঙ্গি হামলা বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার সব দূতাবাসের সমন্বয়ে ইতালি দূতাবাসে একটি স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। তবে আগের বছরের মতো ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো কর্মসূচি থাকছে না।
২০১৬ সালের ১ জুলাই ইফতারের পর রাজধানীর গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় পাঁচ তরুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জেএমবির সদস্য ছিল। রাতভর জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে। অভিযানে পাঁচ হামলাকারী—নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল—নিহত হয়। হামলার আগে তারা সবাই নিজ নিজ পরিবার ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছিল।
হামলায় নিহত হন নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশি এবং একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক। হামলা প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান পুলিশের দুই কর্মকর্তা।
হামলায় নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ভেঙে ফেলা হয়। এখন পর্যন্ত সেটি পুনর্র্নিমাণ করা হয়নি। একইভাবে, তাদের স্মরণে পুলিশের বার্ষিক পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের কর্মসূচিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পালন করা হয়নি।
অতীতে প্রতিবছর জাপান ও ইতালির দূতাবাসের কর্মকর্তারা হোলি আর্টিজানের ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। গত বছর সেই কর্মসূচি হয়নি। এবার সব দূতাবাসের সমন্বয়ে ইতালি দূতাবাসে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এম তানভীর আহমেদ।
তিনি বলেন, “দূতাবাসগুলো সমন্বয় করে ইতালি দূতাবাসে এ দিনটি স্মরণ করবে। তবে ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানানোর কোনো কর্মসূচি নেই।”
নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি পৃথক শ্রদ্ধা নিবেদন বা ‘দীপ্ত শপথ’ পুনর্র্নিমাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তাদের ব্যাপারে এই দিনে কোনো কর্মসূচি নেই। সব পুলিশের আত্মত্যাগের বিষয়ে আমরা নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করে থাকি, পৃথকভাবে কিছু করা হয় না।”
হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার বিচার প্রায় সাড়ে তিন বছর চলে। তদন্ত শেষে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। পরে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ে হাই কোর্ট তাদের সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন। হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশই পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়।
হামলার এক দশক পূর্তিতে দেশে জঙ্গিবাদের বর্তমান অবস্থা নিয়েও আলোচনায় এসেছে ভিন্নধর্মী সরকারি বক্তব্য। ২০২৫ সালে তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি নেই; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিনতাই দমন। একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেন বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। গত এপ্রিল মাসে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ‘জঙ্গি’ তৎপরতা নেই; কিছু উগ্রপন্থী বা চরমপন্থী গোষ্ঠী থাকলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই এমন প্রবণতা দেখা যায়।
তবে ভিন্ন মূল্যায়ন দিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তার ভাষ্য, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ছিল এবং এখনও সেই ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরের সময়ে এ ধরনের মতাদর্শে বিশ্বাসীদের আরও সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সানা/আপ্র/১/৭/২০২৬