আলী আহমাদ মাবরুর
গতকাল চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সাহেব মারা গেছেন। তিনি বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা সাহেবের মেঝ ছেলে ছিলেন। পিতা-পুত্র দুজনেই ব্যক্তি হিসেবে সফল হলেও এই দুজন মানুষের জীবন আমাদের সামনে খুব অনিবার্য একটি বাস্তবতা তুলে ধরে আর তাহলো পিতা ও পুত্রের আদর্শিক ভিন্ন অবস্থান।
একটু আগে অভিনেতা তারিক আনাম খানের একটি ভিডিও দেখলাম। ভিডিওটা দেখেই স্ট্যাটাসটি লেখার চিন্তা মাথায় আসলো। তারিক আনাম খান পরিষ্কারভাবে বললেন, মুস্তাফা মনোয়ার সাহেব তার বাবাকে শ্রদ্ধা করতেন যদিও তার বাবার সাথে, চিন্তার সাথে, আদর্শের সাথে তার মিল ছিল না। এ বাস্তবতাটি দিনে দিনে এখন আরো বেশি অনুভব করছি।
নানা সময় নানা মানুষের কাছে যাই। অনেকের বাসায় যাই। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, যে মানুষগুলোকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করি, যাদেরকে ভীষণই অন্যভাবে আমরা জানি বা মানি; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাসার ভেতরে তার সেই চিন্তার প্রতিফলন নেই। তার পরিবার এমনকী পরবর্তী প্রজন্মই বাবাকে সেভাবে শ্রদ্ধা করে না, যে কারণে আমরা করি।
কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও ইসলামী চিন্তাবিদ। তিনি এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা করেছিলেন, যখন বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ঐতিহ্য, মুসলিম ইতিহাস এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে আধুনিক সাহিত্যরীতিতে উপস্থাপনের মতো খুব বেশি লোক ছিল না। তিনি বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্যকে শক্তিশালীভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন।
গোলাম মোস্তফা বাংলা ভাষায় ইসলামী ভাবধারার সাহিত্যকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ছিলেন। তার কবিতা, প্রবন্ধ ও জীবনীগ্রন্থে ইসলামকে কেবল ধর্ম হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার লেখায় আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাওহিদ, নবীপ্রেম, ইসলামী নৈতিকতা, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রগঠনের মতো বিষয়গুলো বারবার ঠাঁই পেয়েছে।
গোলাম মোস্তফার কালজয়ী সৃষ্টি হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ ‘বিশ্বনবী’। গোলাম মোস্তফা পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদও করেন। এই অনুবাদের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানের কাছে কোরআনের অর্থ সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া।
গোলাম মোস্তফা মনে করতেন, বাংলাভাষী মুসলমানদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ইসলামী ইতিহাস ও মূল্যবোধের যথাযথ প্রতিফলন থাকা উচিত। তিনি বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত ইসলামী প্রবন্ধ লিখতেন। এই প্রবন্ধগুলোতে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার, নৈতিকতা এবং ইসলামী জীবনদর্শন সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতেন।
গোলাম মোস্তফার রাজনৈতিক অবস্থানও স্বতন্ত্র ছিল। কবি গোলাম মোস্তফা পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি পাকিস্তানের আদর্শকে সমর্থন করে কিছু সাহিত্য ও গান রচনা করেন বলেও জানা যায়। তেমনটা সমসাময়িক আরো অনেক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বই করেছিলেন। এই জায়গাতে এসেই তার সন্তানের সাথে তার আদর্শিক মতপার্থক্য তৈরি হয়ে যায়।
পিতার অবস্থানের বিরোধী একটি অবস্থান প্রমাণে মুস্তাফা মনোয়ার সাহেব প্রগতিশীল বলয়ে অবস্থান গড়ে তোলার জন্য অনেক বেশি সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থানে ব্যবধান রাখতে গিয়ে ধর্মীয় অবস্থানও প্রভাবিত হয়ে যায়। কবি গোলাম মোস্তফার ধর্মীয় কাজের সিলসিলাও সন্তান হিসেবে তিনি আর ধরে রাখতে পারেননি।
এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা ও আদর্শে ভয়াবহ পরিবর্তন হওয়ার নজির আরো অনেককে নিয়েই দেওয়া যায়। আমাদের নিজেদের পরিবারেও যেন এরকম দৃষ্টান্ত তৈরি না হয়। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন। আমিন।
লেখক: অনুবাদক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আপ্র/কেএমএএ/০১.০৭.২০২৬