বর্তমান ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। যোগাযোগ, কাজ, ব্যবসা, বিনোদন- সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই তৈরি হয়েছে আরেকটি অদৃশ্য ভয় সাইবার হয়রানি। এর সঙ্গে বিভিন্ন অ্যাডভান্স লেভেলের অ্যাপস এসে এর ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক মন্তব্য, ভুয়া আইডি থেকে হুমকি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয়- এসব অনেক নারীর প্রতিদিনের বাস্তবতা। তবুও অধিকাংশই চুপ থাকেন, লজ্জা বা ভয়ের কারণে আইনের আশ্রয় নিতে চান না। অথচ বাস্তবতা হলো, সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে এখন আইন আছে এবং অভিযোগ করাও আগের চেয়ে অনেক সহজ।
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর একটি আইন হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইনের আওতায় অনলাইন হুমকি, অপমান, মানহানি, ভুয়া তথ্য প্রচারসহ নানা অপরাধ শাস্তিযোগ্য। এছাড়া ইধহমষধফবংয চড়ষরপব ঈুনবৎ ঈৎরসব টহরঃ এবং চড়ষরপব ঈুনবৎ ঝঁঢ়ড়ৎঃ ভড়ৎ ডড়সবহ- ই দুটি উদ্যোগ বিশেষভাবে সাইবার হয়রানির শিকার নারীদের সহায়তা দিতে কাজ করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এখন আর থানায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। ঘরে বসেই অনলাইনে অভিযোগ করা যায়। বাংলাদেশ পুলিশের ‘চড়ষরপব ঈুনবৎ ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ ভড়ৎ ডড়সবহ’ প্ল্যাটফর্মে গিয়ে খুব সহজেই অভিযোগ জানানো সম্ভব। সেখানে নিজের পরিচয় গোপন রেখেও প্রাথমিকভাবে সহায়তা নেওয়া যায়। অভিযোগ করতে সাধারণত যা লাগে- ঘটনার বিবরণ, স্ক্রিনশট বা প্রমাণ এবং যোগাযোগের একটি মাধ্যম। অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট টিম বিষয়টি যাচাই করে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করে। এছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করেও তাৎক্ষণিক সহায়তা চাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দ্রুত রিপোর্ট করার ফলে অপরাধী শনাক্ত করা এবং ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। তাই ভয় বা লজ্জা না পেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবতা হলো সাইবার স্পেস এখন আমাদের বাস্তব জীবনেরই অংশ। তাই এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভয় নয়, সচেতনতা এবং আইনের যথাযথ ব্যবহারই হতে পারে সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। আপনার নীরবতা নয়, আপনার সাহসই হতে পারে পরিবর্তনের শুরু।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ডিজিটাল সচেতনতা গড়ে তোলা। অনেক সময় অজান্তেই আমরা নিজের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা অবস্থান এমনভাবে শেয়ার করি, যা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার সময় প্রাইভেসি সেটিংস ঠিক রাখা, অপরিচিতদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করা এবং সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা- এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো বড় ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পরিবারেও এই সচেতনতা তৈরি জরুরি, বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের জন্য।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রেও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা বাড়ানো দরকার। কারণ অনেক ভুক্তভোগী বুঝতেই পারেন না, তারা যে আচরণের শিকার হচ্ছেন, সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, কর্মশালা বা অনলাইন সেমিনারের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা গেলে মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে শিখবে।
সবচেয়ে বড় কথা- নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করতে হবে। সাইবার হয়রানির দায় কখনই ভুক্তভোগীর নয়, বরং সম্পূর্ণ অপরাধীর। তাই চুপ না থেকে, প্রমাণ সংরক্ষণ করে, প্রয়োজনীয় জায়গায় অভিযোগ জানানোই হতে পারে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ। মনে রাখতে হবে, আপনার একটিমাত্র সাহসী পদক্ষেপই হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেককে একই অভিজ্ঞতা থেকে রক্ষা করতে পারে।
আপ্র/কেএমএএ/০১.০৭.২০২৬