প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে আবেদনকারীদের মধ্যে। চিকিৎসা, ব্যবসা ও ভ্রমণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ভারতে যাতায়াত সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা। একই সঙ্গে নতুন স্বয়ংক্রিয় ‘টাইম-স্লট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়ার দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে বলেও প্রত্যাশা তাদের।
ঢাকার মিরপুরের শিক্ষার্থী সামি আল নাফিস নিলোয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হৃদরোগে আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে ভারতে যেতে চাইলেও তখন ভিসা পাননি। ফলে দেশে থেকেই বাবার চিকিৎসা করাতে হয়েছিল। এবার ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ায় তিনি ভারতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন।
বুধবার (১ জুলাই) যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে আবেদনপত্র জমা দিয়ে নিলোয় বলেন, “আমি নিজেই আবেদন করেছি। খুব সহজে আবেদন জমা দেওয়ার সময় পেয়েছি। আগে আঙুলের ছাপ দেওয়া থাকায় পুরো কাজ ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটেই শেষ হয়েছে।” আগেরবার মেডিকেল ভিসা না পাওয়ার আক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এবার পর্যটন ভিসা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। তার ভাষায়, “আমরা চাই না ভিসা কার্যক্রম কখনও বন্ধ থাকুক। চিকিৎসা, ঘোরাঘুরিসহ নানা প্রয়োজনেই মানুষ ভারতে যায়। তাই ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকুক, এটাই প্রত্যাশা।”
প্রায় দুই বছর সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়ার পর গত ২৮ জুন থেকে ভারতীয় হাই কমিশন আবার সব ধরনের ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে। এর আগে কেবল কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সীমিত সংখ্যক মেডিকেলসহ কিছু ভিসা দেওয়া হচ্ছিল।
গত ২৫ জুন ঢাকায় ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঘোষণা দেন, ২৮ জুন থেকে আবার পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু হবে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার সময় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারত সরকার আবেদন কেন্দ্রগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখে। একই বছরের মাঝামাঝি সময়ে সীমিত পরিসরে কেন্দ্রগুলো চালু হলেও জরুরি ও মেডিকেল ভিসা ছাড়া অন্য সেবা বন্ধ ছিল। এই সময় ভিসাপ্রত্যাশীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আবেদন করেও অনেকে সময়মতো ভিসা পাননি। মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রেও আবেদন জমা দেওয়ার সময় পাওয়া ছিল কঠিন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির প্রেক্ষাপটে পর্যটন ভিসা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেন।
বুধবার সকালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র যমুনা ফিউচার পার্কে গিয়ে দেখা যায়, সকালবেলায় দীর্ঘ সারি থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় কমে আসে। আবেদনকারীদের অনেকেই সহজে আবেদনপত্র জমা দিতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
নীলফামারীর আরমান হোসেন স্ত্রীকে বন্ধ্যত্ব-সংক্রান্ত চিকিৎসার জন্য ভারতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে মেডিকেল ভিসার আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, “প্রথমবার আবেদন করলাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সময় পেয়েছি। স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এখন আবেদন জমা দেওয়া অনেক সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে।”
চুয়াডাঙ্গার গৃহিণী সামিরা স্বামীর চিকিৎসার জন্য রোগী ও সহকারীসহ তিনটি মেডিকেল ভিসার আবেদন করেছেন। নিয়মকানুন না জানায় ট্রাভেল এজেন্টের সহায়তা নিলেও আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তবে এজেন্ট প্রতিটি ভিসার জন্য দেড় হাজার টাকার পরিবর্তে সাত হাজার টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
সাতক্ষীরার আশাশুনি থেকে আসা এক আবেদনকারী বলেন, স্থানীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র চালু থাকলে দূরপাল্লার যাতায়াত, সময় ও অর্থ-সবই সাশ্রয় হতো। তাই সাতক্ষীরাসহ দেশের সব ভিসা আবেদন কেন্দ্র দ্রুত চালুর দাবি জানান তিনি।
মেডিকেল ভিসার আবেদন করতে আসা গৃহিণী তাপসী সাহা বলেন, চিকিৎসা শেষে ভারতে কিছু জায়গা ঘুরে দেখারও ইচ্ছা রয়েছে। আবেদন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “ভিসা কার্যক্রম সবসময় স্বাভাবিক থাকুক, সবার যাতায়াত নির্বিঘ্ন হোক।”
টাইম-স্লট ব্যবস্থায় পরিবর্তনে স্বস্তির আশা: অনলাইনে আবেদন করলেও আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় বা ‘টাইম-স্লট’ না পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির অভিযোগ করে আসছিলেন ভিসাপ্রত্যাশীরা। এ সমস্যা কমাতে ১ জুলাই থেকে নতুন স্বয়ংক্রিয় সময় বরাদ্দ ব্যবস্থা চালু করেছে ভারতীয় হাই কমিশন।
নতুন ব্যবস্থায় অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর আবেদন কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদন জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হবে। আগে আবেদনকারীদের নিজে সময় নির্বাচন করতে হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময় পাওয়া যেত না। এতে দালাল ও এজেন্টদের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যেত বলে অভিযোগ ছিল।
দিল্লিতে রোমানিয়ার দূতাবাসে ভিসা আবেদনের জন্য ভারতীয় দ্বৈত প্রবেশ ভিসার সময় পেতে দেড় মাস অপেক্ষা করেছেন কেরানিগঞ্জের মো. তপন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছি। নতুন ব্যবস্থা চালু হয়েছে, এখন স্লট পাওয়া যেন সহজ হয়। সার্ভারের সমস্যার কারণেও আমরা অনেক দুর্ভোগে পড়েছি।” তিনি বলেন, “স্লটের নামে যে ভোগান্তি হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের মুক্তি দিতে হবে। যেন সহজেই ভিসা ফি জমা দিতে এবং আবেদন সম্পন্ন করতে পারি।”
২০২৪ সালের শুরুতে কাশ্মির, দিল্লি, আগ্রা ও অমৃতসর ভ্রমণ করা মোহাম্মদ প্রান্ত এবার সিমলা, মানালি, দিল্লি ও কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “কম খরচে পাশের দেশ ভারতে ভ্রমণের সুযোগ আবার ফিরে এসেছে। এটা আমাদের জন্য আনন্দের খবর।” স্লট পদ্ধতি আরো সহজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “স্লট ব্যবস্থার কারণে অনেকেই অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। এটি আরো সহজ ও স্বাভাবিক করা গেলে সাধারণ আবেদনকারীদের ভোগান্তি অনেক কমবে।”
ইন্ডিয়া টুডে বলছে ঢাকায় উপচে পড়া: ইন্ডিয়া টুডে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ভারতীয় ভিসা চালুর পর ঢাকায় উপচে পড়া ভিড়। দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য আবারো পর্যটন ভিসা চালু করেছে ভারত। ভিসা কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার ঘোষণা আসার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোতে দেখা দিয়েছে উপচে পড়া ভিড়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রগুলোতে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে ভিসা বন্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। কেন বাংলাদেশের নাগরিকরা ভারত ভ্রমণের জন্য উন্মুখ, তা তুলে ধরে জানানো হয়েছে-চিকিৎসাই প্রধান কারণ। আগে প্রতি বছর ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারতে যাতায়াত করতেন। ভিসা সীমিত হওয়ার পর ২০২৫ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজারে, যার বড় অংশই ছিল মেডিকেল ভিসা। ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে স্বস্তি ফিরেছে পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও। গত দুই বছরে বাংলাদেশি পর্যটক কমে যাওয়ায় কলকাতার নিউ মার্কেট ও সদর স্ট্রিট এলাকায় হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সময়ে এই এলাকায় প্রায় ১ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। ভিসা চালু হওয়ায় ব্যবসা আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে ইন্ডিয়া টুডে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১/৭/২০২৬