পুরুষ যখন একা ঘোরে, তখন সে পর্যটক। কিন্তু নারী যখন একা ঘোরে, সমাজের চোখে সে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়; এমনকি কয়েকজন নারীও যদি দলবেঁধে বেড়াতে যায়, তাহলেও তারা একা! কারণ তাদের সঙ্গে কোনো অভিভাবক বা পুরুষ নেই। একজন বা কয়েকজন মেয়ে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে কোনো অচেনা জায়গায় যাচ্ছে- এই দৃশ্য এখনো দেশের অনেক অঞ্চলের মানুষ সহজভাবে নিতে পারে না। গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত মানুষের বাঁকা চাহনি, কৌতূহলী ও অযাচিত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নারী পর্যটকদের। তাই কোনো স্থানে যাওয়ার আগে সেখানকার পরিবেশ, মানুষের মানসিকতা ও থাকার জায়গা সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার
‘বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যেও’- এভাবেই একসময় নারীদের যে কোনো স্বাধীন ইচ্ছা, বিশেষ করে ভ্রমণ ইচ্ছাকে বিয়ের দোহাই দিয়ে দমন করে রাখা হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি নারী এই অদৃশ্য শিকল ভেঙেছে। তারা এখন শুধু কারও হাত ধরে নয়, বরং নিজের আত্মপরিচয়, আনন্দ এবং মানসিক মুক্তির খোঁজে একা কিংবা সমমনা নারীদের সঙ্গে দলবেঁধে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। আধুনিক নারী বুঝতে পেরেছে যে, ভ্রমণ কোনো পুরস্কার নয় যা বিয়ের পর অর্জিত হবে; বরং ভ্রমণ হলো একজন মানুষের আনন্দদায়ক মৌলিক অধিকার। ফলে ফেসবুক বা বিভিন্ন মাধ্যমে গড়ে উঠেছে কেবল নারীদের ভ্রমণসংক্রান্ত অসংখ্য গ্রুপ ও কমিউনিটি, যেখানে প্রতি উইকেন্ডেই হাজারো নারী প্রকৃতির টানে ঘর থেকে বের হচ্ছে। তবে এই শিকল ভাঙার গল্পের উল্টো পিঠে এখনও জড়িয়ে আছে এক বড় প্রশ্ন- নারীদের ভ্রমণ কতা নিরাপদ?
ভ্রমণ মানে তো শুধু প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও কিছু সেলফি তোলা, ভিডিও করাই নয়- বরং আরও কিছু। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে না মিশলে, আলাপ না করলে, স্থানীয় খাবার চেখে না দেখলে ভ্রমণের অনেকটাই বাকি রয়ে যায়। তাই সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ জমালেও তাদের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়েই কথা বলতে হবে। বাংলাদেশের শ্যামবর্ণের সাধারণ মানুষ আজও বড্ড সহজ-সরল। বেশির ভাগ সময় নারীদের প্রতি তারা সংবেদনশীল ও সম্মানজনক আচরণটিই করে। তাই অচেনা নারীদের ঘুরতে দেখে তারা যেমন কৌতূহলী হয়ে পড়ে, অযাচিত প্রশ্ন করে- তেমনি আবার আপদে-বিপদে সাহায্যও করে থাকে উদারভাবে।
বেড়াতে গেলে নারীদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা। দেশের হাইওয়ে ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে নারীবান্ধব ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুমের তীব্র সংকট রয়েছে। দীর্ঘ ভ্রমণের সময় এটি নারীদের জন্য কেবল অস্বস্তিকরই নয়, বরং বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়াও গণপরিবহনে ভ্রমণ, বিশেষ করে নাইট কোচে যাতায়াত করাটা এখনও নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও আতঙ্কের। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীও চেকিংয়ের নামে নারী পর্যটকদের রীতিমতো হেনস্তা করে। কারণটি শুধুই লৈঙ্গিক। যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীই এভাবে নারীদের হেনস্তা করে থাকে, সেখানে বখাটেরা কীভাবে উত্ত্যক্ত করতে পারে, সে কথা না হয় উহ্যই থাকল।
সাধারণ মানের আবাসিক হোটেলে নারীদের রুম বুকিং দিতে অনীহা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া হোটেলগুলোয় নিরাপত্তা একেবারেই উপেক্ষিত। সিসিটিভি বা হোটেলের বিশ্বস্ত কর্মীর অভাবে নারীদের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই নারীরা চাইলেও পুরুষদের মতো সাধারণ হোটেলে রাত্রি যাপন করতে পারে না। অভিজাত হোটেল বা রিসোর্টেই তারা উচ্চমূল্যে বুকিং দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাতেও কি নারী রক্ষা পায়? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই গেল।
সম্প্রতি একটি ট্যুর গ্রুপের হোস্ট তৌফিক রহমান তমালের নামে যৌন হয়রানির অভিযোগ আসার পর বেরিয়ে আসে কেঁচো খুঁড়তে সাপ। তমালের মতো বিশ্বস্ত মুখোশধারী মানুষের এই অপরাধ কেবল কয়েকজন নারীর ক্ষতি করেনি, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের নারী পর্যটনে এক বিশাল ট্রমা তৈরি করেছে। অভিভাবকদের অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে মেয়েরা একা বা বন্ধুদের সঙ্গে ট্যুরে যেত, এ ঘটনার পর তাদের মনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে অনেক নারীর স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর ডানা আবার সংকুচিত হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। যার নিজে ভ্রমণের বিশ্বস্ত পথ প্রদর্শক বা ‘হোস্ট’ হওয়ার কথা ছিল, তার দ্বারা নারী পর্যটকদের এভাবে ফাঁদে ফেলা এবং হেনস্তা করার ঘটনাটি তীব্র সামাজিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এখন সুপরিচিত বা নিবন্ধিত গ্রুপের সঙ্গে যেতেও নারীরা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাই ট্রাভেল কমিউনিটিগুলোকে নিরাপদ ও নারীবান্ধব করে তোলার জন্য অ্যাডমিন বা হোস্টের অতীত রেকর্ড, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন আছে কি না এবং নারী ভ্রমণকারীদের রিভিউ কেমন- তা কঠোরভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধীর শাস্তিও নিশ্চিত করতে হবে।
নিশাত-ওয়াজফিয়া-নিম্মিরা জয় করেছেন এভারেস্ট, নাজমুন নাহার ভ্রমণ করেছেন ১৮৪টি দেশ, এই উদাহরণগুলোই বারবার বড় গলায় পুনরাবৃত্তি হয়। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেরকের বেশি নারী। সে তুলনায় নারী পর্যটক বলতে গেলে কম। বাংলাদেশের নারীরা আরও বেশি ভ্রমণে উৎসাহী হয়ে উঠুক। এ জন্য তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। নারী যত বেশি ভ্রমণ করবে, ততই সে নিজেকে চিনতে পারবে, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে আবিষ্কার করতে পারবে। তাই নারীর ভ্রমণ নিরাপদ করতে রাষ্ট্রকেও যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।
আপ্র/কেএমএএ/০১.০৭.২০২৬