হাসিকে কেবল মানুষের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য মনে হলেও বাস্তবে তা নয়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের সঙ্গে বড় বানরজাতীয় প্রাণীর হাসির ছন্দে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। গবেষকদের মতে, এ মিল ইঙ্গিত করে যে মানুষ ও বড় বানরজাতীয় প্রাণীর শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের মধ্যেও একই ধরনের হাসির বৈশিষ্ট্য ছিল।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গবেষণায় মানুষের হাসির সঙ্গে শিম্পাঞ্জি, বোনোবো, গরিলা ও ওরাংওটাংয়ের হাসির তুলনা করা হয়েছে। এতে প্রজাতিগুলোর হাসির মধ্যে যেমন মিল পাওয়া গেছে, তেমনি মানুষের হাসির কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যও চিহ্নিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিটি প্রজাতির হাসিই নিয়মিত ছন্দময় বিন্যাস অনুসরণ করে। অর্থাৎ, ধারাবাহিকভাবে উচ্চারিত শব্দগুলোর মধ্যে প্রায় সমান সময়ের ব্যবধান থাকে। গবেষকদের ধারণা, এই বৈশিষ্ট্য মানুষ ও অন্যান্য বড় বানরজাতীয় প্রাণীর মধ্যে একইভাবে বিদ্যমান থাকায় তা প্রায় দেড় কোটি বছর আগে পূর্ব বা মধ্য আফ্রিকায় বসবাসকারী তাদের শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের কাছ থেকেই এসেছে।
গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির প্রাইমেটোলজিস্ট ও গবেষণা ফেলো চিয়ারা ডি গ্রেগোরিও বলেন, মানুষের হাসির বিবর্তনীয় শিকড় বড় বানরজাতীয় প্রাণীদের হাসির সঙ্গে মিল থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক থেকে তা আলাদা।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘কমিউনিকেশনস বায়োলজি’তে প্রকাশিত এ গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের হাসি অন্য বড় বানরজাতীয় প্রাণীর তুলনায় দ্রুততর, বেশি পরিবর্তনশীল এবং সামাজিক পরিস্থিতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল। শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোর হাসি মানুষের হাসির সঙ্গে গরিলা বা ওরাংওটাংয়ের তুলনায় বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও ছন্দের জটিলতা ও নমনীয়তার ক্ষেত্রে মানুষের হাসি এখনও অনন্য।
গবেষকদের মতে, মানুষের বিবর্তনীয় ধারা শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোর ধারা থেকে প্রায় ৭০ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে যায়।
গবেষণায় চার জোড়া শিম্পাঞ্জি, তিনটি বোনোবো, দুটি গরিলা, চারটি ওরাংওটাং এবং চারজন মানুষের হাসির রেকর্ড বিশ্লেষণ করা হয়। মোট ১৪০টি হাসির পর্বে প্রতিটি শব্দের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান পরিমাপ করেন গবেষকেরা।
জার্মানি ও মালয়েশিয়ার চিড়িয়াখানায় প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশে এসব রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়। তখন তারা খেলায় মগ্ন ছিল অথবা পরিচিত পরিচর্যাকারীরা তাদের আলতো করে শুঁড়শুড়ি দিচ্ছিলেন।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মানুষ পরিস্থিতি অনুযায়ী হাসির গতি ও ছন্দ পরিবর্তন করতে পারে। ডি গ্রেগোরিও বলেন, বড় বানরজাতীয় প্রাণী ও মানুষের বিবর্তনের ধারায় হাসির ধরনও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে মানুষের মতো পরিস্থিতিভেদে হাসির সময়গত গঠন বদলে ফেলার সক্ষমতার প্রমাণ অন্য বড় বানরজাতীয় প্রাণীর ক্ষেত্রে খুবই সীমিত। ভবিষ্যৎ গবেষণায় এ বিষয়ে আরো সূক্ষ্ম পার্থক্য উঠে আসতে পারে।
গবেষকদের মতে, এ গবেষণা মানুষের ভাষা ও কথোপকথনের উৎপত্তি বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডি গ্রেগোরিও বলেন, মানুষের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়দের হাসি বিশ্লেষণ করলে শুধু ভাষার উৎস নয়, মানুষ হিসেবে আমাদের সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের ভিত্তিও আরো স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব। বিবর্তনের ধারায় ছন্দের নমনীয়তার যে বিকাশ দেখা গেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে মানুষের পূর্বপুরুষদের কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা আধুনিক বড় বানরজাতীয় প্রাণীদের তুলনায় আরো উন্নত হতে পারে, যা ভাষার বিকাশের পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে কাজ করেছে।
হাসির সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে হাসি হলো ছন্দময় এক ধরনের কণ্ঠস্বর, যা সাধারণত খেলাধুলার মতো ইতিবাচক সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি সামাজিক সংকেত হিসেবে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং পারস্পরিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। খেলাধুলার সময় হাসি জানিয়ে দেয় যে আচরণটি আক্রমণাত্মক নয়, বরং বন্ধুত্বপূর্ণ।
তিনি আরো বলেন, বড় বানরজাতীয় প্রাণী ছাড়াও অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে হাসির মতো আচরণ দেখা যায়। যেমন, কুকুর খেলাধুলার সময় বিশেষ ধরনের মুখভঙ্গি ও হাঁপানোর মতো শব্দের মাধ্যমে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এ ধরনের সংকেত অন্য প্রাণীদেরও বুঝিয়ে দেয় যে তাদের আচরণ আক্রমণাত্মক নয়। আরো কয়েকটি স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেও খেলাধুলার সঙ্গে সম্পর্কিত একই ধরনের কণ্ঠস্বরের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র: রয়টার্স
সানা/ডিসি/আপ্র/১/৭/২০২৬