চাঁদে স্থায়ী মানবঘাঁটি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণযান, রোভার, ক্ষুদ্র চন্দ্রযান এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে বিস্তারিত কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) নাসা ঘোষণা দিয়েছে, অ্যাস্ট্রোবোটিক, ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেস ও ইনটুইটিভ মেশিনস-এই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৫৯ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি দেওয়া হয়েছে। চারটি পৃথক মিশনের মাধ্যমে তারা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চাঁদে পৌঁছে দেবে। এর মধ্যে অ্যাস্ট্রোবোটিক দুটি মিশনের দায়িত্ব পেয়েছে।
নাসা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের জন্য তৈরি ‘প্রমিজ’ রোভারকেও চাঁদে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
এসব উদ্যোগ চাঁদে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। লক্ষ্য হলো, আগে থেকেই রোবটচালিত যান দিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা, যাতে পরবর্তী সময়ে মহাকাশচারীরা সেখানে পৌঁছে সেই সুবিধা ব্যবহার করে বসবাস ও গবেষণাকাজ পরিচালনা করতে পারেন।
নাসার চন্দ্রঘাঁটি কর্মসূচির নির্বাহী কর্মকর্তা কার্লোস গার্সিয়া গালান জানান, এটি কর্মসূচির প্রথম ধাপ বা ‘ফেজ-১’। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে এ ধাপের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
গত মাসেও একই কর্মসূচির আওতায় আরো কয়েকটি চুক্তি ঘোষণা করে নাসা। পরিকল্পনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে চাঁদে প্রথম চাপ-নিয়ন্ত্রিত আবাস নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ২০৩০-এর দশকে ধাপে ধাপে চন্দ্রঘাঁটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। শেষ পর্যন্ত মহাকাশচারীদের জন্য চাঁদে আধা-স্থায়ী বসতি গড়ে তোলাই নাসার লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশ অভিযানে চীনের দ্রুত অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই কর্মসূচি। গত এক দশকে চীনের মহাকাশ কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কারণে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বেড়েছে।
বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ: উচ্চাভিলাষী এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে ইতোমধ্যে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়েছে নাসা।
জেফ বেজোসের প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিন চলতি বছরের শেষ দিকে তাদের বৃহৎ রোবোটিক অবতরণযান ‘ব্লু মুন’-এর একটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল। ওই অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, কারণ সেখানে জমাট বরফের মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে সেই বরফ থেকে পানীয় পানি ও রকেটের জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে মে মাসে ব্লু অরিজিনের ‘নিউ গ্লেন’ রকেট উৎক্ষেপণস্থলেই বিস্ফোরিত হওয়ায় পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা লাগে। দুর্ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তা পুনর্র্নিমাণে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে ‘ব্লু মুন’ মিশনের সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কার্লোস গার্সিয়া গালান জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ‘ব্লু মুন’ অবতরণযান অন্য কোনো উৎক্ষেপণযানের মাধ্যমে পাঠানোর বিকল্পও বিবেচনা করছে নাসা। নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে ব্লু অরিজিনের প্রস্তুতি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউ গ্লেন দুর্ঘটনার পর নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজাকম্যানও জানিয়েছেন, যেকোনো জটিলতা মোকাবিলায় বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে সংস্থাটি।
প্রায় তিন হাজার কোটি ডলারের প্রকল্প: ব্লু অরিজিন ছাড়াও চাঁদ কর্মসূচিতে নাসার আরো একাধিক অংশীদার রয়েছে। ব্লু মুন অবতরণযান দুটি সংস্করণে তৈরি হবে, যার একটি মহাকাশচারী পরিবহনের উপযোগী করা হবে। অন্যদিকে স্পেসএক্স চাঁদে মানুষ পরিবহনের জন্য ‘স্টারশিপ’ মহাকাশযান উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও সেটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।
চাঁদে মালামাল পরিবহনে ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেস এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল প্রতিষ্ঠান। তাদের ‘ব্লু গোস্ট’ যান গত বছর চাঁদের বিষুবীয় অঞ্চলের কাছে সফলভাবে অবতরণ করে। অন্যদিকে ইনটুইটিভ মেশিনস দুবার চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অবতরণযান পাঠাতে সক্ষম হলেও উভয় ক্ষেত্রেই যানগুলো অবতরণের পর কাত হয়ে পড়ে।
নাসার হিসাব অনুযায়ী, চন্দ্রঘাঁটি নির্মাণে মোট ব্যয় হতে পারে প্রায় তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
এই কর্মসূচি নাসার ‘আর্টেমিস’ অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ পর্যন্ত আর্টেমিস কর্মসূচিতে প্রায় ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। এর আওতায় একটি মনুষ্যবিহীন পরীক্ষামূলক অভিযান এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চাঁদকে কেন্দ্র করে একটি ঐতিহাসিক মনুষ্যবাহী অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
পাঁচ দশকের বেশি সময় পর আবার মানুষকে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে নাসা। দীর্ঘমেয়াদে সেখানে স্থায়ী মানববসতি গড়ে তোলাই সংস্থাটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সূত্র: সিএনএন
সানা/ডিসি/আপ্র/১/৭/২০২৬