স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে দলের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ সমাবেশে সরকারের বিরুদ্ধে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তোলেন নেতারা।
দাবি পূরণ না হলে সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
সমাবেশে এনসিপির পক্ষ থেকে উত্থাপিত চার দফা দাবি হলো- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ; ‘একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি’ বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন; মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতাবিরোধী সব আইন বাতিল এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী পাস না করা; জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকর এবং ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমতি চাওয়া’ পুলিশ মহাপরিদর্শককে অপসারণ।
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি সরকারের কাছে, তারেক রহমানের কাছে দেশ পরিচালনা করার কোনো ধরনের পরিকল্পনাই নাই। তাদের প্ল্যান-পরিকল্পনা হয়েছে, কীভাবে দেশ থেকে দুর্নীতি করবে, কীভাবে লুটপাট করবে, কীভাবে চাঁদাবাজি করবে, কীভাবে সন্ত্রাস কায়েম করবে।”
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি। আপনাদের সামনে আমাদের প্রতিশ্রুতি, পতিত স্বৈরাচার এবং এই নব্য স্বৈরাচার, এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব, ইনশাআল্লাহ।”
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ও করিডর প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা দেখছি জাপানে গিয়ে আবারও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডর তৈরি করার চেষ্টা করছে। সরকার অবৈধ করিডর ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এ ধরনের কোনো অবৈধ করিডর বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।”
আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আগামী ডিসেম্বরে যদি গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে নতুন করে তৈরি করা না হয়, বাংলাদেশের জনগণ আবার নামবে। এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে এক বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যা ছাড় দেব না, ইনশাআল্লাহ।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, খুন ও গুমের ঘটনায় সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, “নতুবা সারা বাংলাদেশের সর্বত্রই আমরা মিছিল করব। সেই মিছিল নিয়ে আমরা তারেক রহমানকে ঘেরাও করে আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।”
সমাবেশে প্রধান বক্তা এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “বিএনপি সরকার গঠন করার আগে বারবার বলেছে, নির্বাচন হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। নির্বাচন হওয়ার নয় মাস হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা- কিছুই ঠিক হয়নি। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে দেশ ঠিক হওয়া দূরের কথা, দল হিসেবে বিএনপিও ঠিক হয়নি।”
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত নয় মাসে ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী খুন হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আখতার হোসেন বলেন, “বিএনপির নিজেদের মধ্যে খুন, বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখলদারিত্বের মতো ঘটনা ঘটছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই খুনের বিচার না করে, ছিনতাই-দখলবাজি বন্ধ না করে এক ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সংবিধান রক্ষার পেছনে নেমেছেন। আমরা স্পষ্ট করে বলি, যে ব্যর্থ বাংলাদেশ আপনারা তৈরি করেছেন, এর দায় সরাসরি তারেক রহমানকেই নিতে হবে।”
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “নির্বাচনের পর তারা জুলাই সনদ তো দূরের কথা, ৩১ দফার কথাও ভুলে গেছে। যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, তাদের সরিয়ে ‘নেপোকিডদের’ রাজত্ব শুরু করেছে। ফ্যাসিবাদের সময় যারা বাবার পরিচয় দেয়নি, সরকারে আসার পর তারাই এসে টেন্ডারসহ সব কাজে বাবার পরিচয়ে বসে গেছে। ফলে সেদিন দূরে নেই, বিএনপির যারা আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে গুলি খেয়েছেন, তারাও আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে দাঁড়াবেন।”
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “বাংলাদেশের বড় দুটি সিন্ডিকেটের নাম মেঘনা গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপ। এই সিন্ডিকেটের কারণে খেটে খাওয়া মানুষ, কুলি, মজুর, কৃষকসহ প্রত্যেকের ঘরে টান পড়েছে। যারা আমাদের পেটে লাথি দিয়েছে, তাদের নতুন করে শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে।”
ঢাকায় অটোরিকশা বন্ধ ও হকার উচ্ছেদ কার্যক্রমকে স্বাগত জানালেও গণপরিবহন ব্যবস্থার সমালোচনা করেন তিনি।
সমাবেশে এনসিপির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব, আকরাম হুসাইন সিএফ, সারোয়ার তুষার, আব্দুল্লাহ আল আমিন, আব্দুল হান্নান মাসউদ, আতিক মুজাহিদ, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/৩০/১০/২০২৬