পহেলা বৈশাখের ‘ঐতিহ্য’ ধরে রাখতে ‘মঙ্গল’ নাম জুড়ে দিয়েই শোভাযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি আয়োজনের কথা বলেছেন একদল সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মী।
এর মধ্যে ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ প্রতিপাদ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রা করবে ‘বর্ষবরণ পর্ষদ’।
অন্যদিকে নাট্যসংগঠন স্বপ্নদল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, তারা ‘বর্ষ আসুক বর্ষ যাক, থিয়েটার চিরসাথী থাক’ স্লোগানে ‘মঙ্গল নাট্যাভিনয়ে’ চিত্রাঙ্গদা নাটকের দুটি বিশেষ প্রদর্শনী করবে।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকাল ৫টা ও সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে এসব প্রদর্শনী হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যনাট্যে নির্দেশনা দিয়েছেন জাহিদ রিপন। এবার পহেলা বৈশাখ পড়েছে মঙ্গলবার। ফলে সপ্তাহের দিনের সঙ্গেও ‘মঙ্গল’ যুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করছেন নাট্যকর্মী মাহফুজ সুমন।
তিনি একটি সংবাদসংস্থাকে বলেন, ‘মঙ্গল শব্দ নিয়ে এত আপত্তি? তাহলে সপ্তাহের দিন থেকেও কি ‘মঙ্গল’ বাদ দেওয়া হবে? শব্দ নিয়ে এই আপত্তির কোনো মানেই হয় না।’
‘মঙ্গল’ শব্দ নিয়ে বিতর্ককে ‘অনর্থক’ বলে মনে করেন সংস্কৃতিকর্মী মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও। সম্প্রতি শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। পহেলা বৈশাখ মূলত সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও কৃষকের উৎসব।
‘আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ গণতান্ত্রিক সরকার। গণতন্ত্রে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য থাকবে। এখন থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।’
আশির দশকে পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে যে শোভাযাত্রা বের হত, পরে তা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রায়’ রূপ নেয়। ২০১৬ সালে ইউনেসকো এই শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার’ বিরোধিতা শুরু করে। ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নাম হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। এবার এ শোভাযাত্রার নাম ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। নববর্ষ বরণে ওইদিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে এ শোভাযাত্রা বের হবে।
এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য, ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এতে থাকবে পাঁচটি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন মোটিফ। শিল্পকর্মের মধ্যে থাকছে- মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া।
চারুকলার শোভাযাত্রা থেকে ‘মঙ্গল’ বাদ দেওয়া হলেও বৈশাখের প্রথম দিন সকালে ধানমন্ডি থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করবেন একদল নাট্যকর্মী। গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও মূকাভিনয়সহ দিনব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনও থাকছে তাদের। এ আয়োজনের উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রায়’ যুক্ত ছিলেন।
এদের একজন তক্ষশিলা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নাদিমুল ইসলাম বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। ২০২৪ সালের পর থেকে আমরা প্রতিবন্ধতার শিকার হয়েছি। নাম বদলে দিলেও আমাদের এই ঐতিহ্য, এই সংস্কৃতিকে আমরা রক্ষা করবো অবশ্যই।’
এদিকে আরো কয়েকটি সংগঠনও আলাদা করে পহেলা বৈশাখে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছে, চারণ সংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, সাম্যবাদী আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি প্রগতিশীল সংগঠন।
চারণ ও ছাত্রফ্রন্টের যৌথ আয়োজনে এই শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য, ‘নতুন বছরের সূর্যে জাগুক মুক্তির গান, যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রাণ’। পহেলা বৈশাখের সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সড়কদ্বীপ থেকে তাদের এই শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার কথা।
সানা/আপ্র/১৪/৪/২০২৬