দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ধরে রাখার লক্ষ্যে মাঠে নামছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে মরিয়া ভারত। উইমেনস সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে শনিবার (৬ জুন) গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল।
ফাইনালের আগে দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচদের মধ্যে ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অধিনায়ক মারিয়া মান্দা ও ভারত অধিনায়ক সঙ্গীতা বাসফোরে একসঙ্গে ভক্তদের সঙ্গে ছবি তুলেছেন। দুই কোচ পিটার জেমস বাটলার ও ক্রিসপিন ছেত্রিও সময় কাটিয়েছেন সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। তবে মাঠের লড়াইয়ে সেই বন্ধুত্বের কোনো প্রভাব থাকবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের সামনে টানা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জয়ের সুযোগ। ২০২২ ও ২০২৪ সালের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে ইতিহাস গড়তে চায় মারিয়া-আফঈদারা। অন্যদিকে দুই আসর পর ফাইনালে উঠে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের মুকুট পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য ভারতের।
ফাইনালের আগে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম মনিকা চাকমা। ডান পায়ের গোড়ালির চোট পুরোপুরি গুরুতর না হলেও ছন্দে ফিরতে পারেননি তিনি। কোচ বাটলারও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভারতের বিপক্ষে তাঁর খেলার সম্ভাবনা খুবই কম।
অন্যদিকে শক্তি বেড়েছে ভারতের। পেরুর একটি ক্লাবে খেলা ফরোয়ার্ড মনিষা কল্যাণ দলে যোগ দিয়েছেন। ফিফার নির্ধারিত সময়সূচির আগে ক্লাব থেকে ছাড়পত্র না পাওয়ায় তিনি গ্রুপ পর্ব ও সেমিফাইনালে খেলতে পারেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতেই ভারত মালদ্বীপকে ১১-০ গোলে এবং বাংলাদেশকে ৩-০ ব্যবধানে হারায়। পরে সেমিফাইনালে ভুটানকে ১-০ গোলে পরাজিত করে ফাইনাল নিশ্চিত করে।
জাতীয় দলের হয়ে ১৫ গোল করা মনিষা ফাইনালে নিজের প্রভাব দেখাতে মুখিয়ে আছেন। অধিনায়ক সঙ্গীতা বাসফোরেও দ্রুত গোল করে বাংলাদেশকে চাপে ফেলার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের আক্রমণভাগ অবশ্য পুরো টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পায়নি। মালদ্বীপের বিপক্ষে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর দ্রুততম গোল এবং নেপালের বিপক্ষে ঋতুপর্ণা চাকমার অলিম্পিক গোল সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। দলের হয়ে গোলদাতাদের তালিকায় আছেন সুরভি আকন্দ প্রীতি, কোহাতি কিসকু ও উমহেলা মারমাও।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, রক্ষণভাগের ভুল এবং আক্রমণভাগে পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাবও বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণ। গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলের পরাজয় সেই চাপ আরো বাড়িয়েছে।
তবে সেমিফাইনালে নেপালের বিপক্ষে জয় দলকে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে দল এখন শিরোপা লড়াইয়ে পুরোপুরি মনোযোগী। একদিনের পুনরুদ্ধার পর্ব শেষে শুক্রবার পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন করেছে বাংলাদেশ। মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি ভিডিও বিশ্লেষণেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন কোচ বাটলার।
পরিসংখ্যানও ভারতের পক্ষেই কথা বলছে। সাফে দুই দলের নয় দেখায় ভারতের জয় ছয়টিতে, বাংলাদেশের দুটি এবং একটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। চলতি আসরে ভারত এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৫ গোল করেছে এবং তাদের জালে কোনো গোলও হজম হয়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ তিন ম্যাচে পাঁচ গোল করলেও হজম করেছে ছয়টি। আরো একটি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের বিপক্ষে—ভারতের মাটিতে এখনো কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি তারা। যদিও গত দুই আসরে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের দুটি জয়ই এসেছে কাঠমান্ডুতে।
তবে ফাইনালের চাপ নিয়ে দুই কোচের মূল্যায়ন প্রায় একই। বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলারের মতে, এটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ম্যাচ। ভারত কোচ ক্রিসপিন ছেত্রিরও বিশ্বাস, হারানোর তেমন কিছু না থাকায় বাংলাদেশ অনেকটাই নির্ভার থেকে খেলতে পারবে, আর চাপটা বেশি থাকবে ভারতের ওপর।
সব হিসাব-নিকাশের বাইরে ফাইনাল মানেই আলাদা লড়াই। ২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো সাফের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। শিলিগুড়ির সেই ফাইনালে জিতেছিল ভারত। এক দশক পর সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে।
দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের দুই শক্তিশালী দলের এই শিরোপা লড়াইয়ে তাই উত্তেজনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আবেগ—সবকিছুরই পূর্ণ উপস্থিতি থাকার আভাস মিলছে।
সানা/আপ্র/৬/৬/২০২৬