স্পেন কিংবা বেলজিয়ামের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সুযোগ ছিল ইসমায়েল সাইবারির সামনে। তবে তিনি বেছে নিয়েছেন মরক্কোকে। সেই সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করে চলেছেন ২৫ বছর বয়সী এই ফুটবলার।
চলতি বিশ্বকাপে নতুন ভূমিকায় খেলেও দলের সবচেয়ে বড় ভরসায় পরিণত হয়েছেন তিনি। তার গোলেই বিশ্বকাপের পরবর্তী পর্বে ওঠার স্বপ্ন দেখছে মরক্কো। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুটি ম্যাচ খেলেছে মরক্কো।
ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করার ম্যাচে দলের একমাত্র গোলটি করেন সাইবারি। এরপর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে জালের দেখা পান ম্যাচের মাত্র ৭১ সেকেন্ডে। দুই ম্যাচে মরক্কোর করা দুটি গোলই এসেছে তার পা থেকে।
‘সি’ গ্রুপে দুই ম্যাচ শেষে ৪ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মরক্কো। সমান পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে ব্রাজিল। গ্রুপপর্বে তাদের শেষ প্রতিপক্ষ হাইতি। তুলনামূলক দুর্বল এই দলের বিপক্ষে জয় পেলে নকআউট পর্বে ওঠার পথ অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে মরক্কোর।
বিশ্বকাপে মরক্কোর সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারিগর সাইবারি। ব্রাজিলের বিপক্ষে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার পর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও দ্রুত গোল করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করা আফ্রিকার দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে নাম লিখিয়েছেন সাইবারি। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন মিশরের মোহামেদ সালাহ। ২০২৩ সালে মরক্কোর জার্সিতে অভিষেক হয় সাইবারির। তার এই উত্থানের পেছনে বড় অবদান রয়েছে কোচ মোহামেদ ওয়াহবির। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন কোচ ওয়ালিদ রেগরাগি। তার অধীনে সাইবারি খেলতেন প্লে-মেকার কিংবা উইঙ্গার হিসেবে। তবে ওয়াহবি এসে তার ভেতরে ভিন্ন সম্ভাবনা খুঁজে পান। গতি, কৌশল এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে ভেতরে ঢুকে যাওয়ার সামর্থ্য দেখে তাকে মূল স্ট্রাইকারের ভূমিকায় খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন ওয়াহবি। কোচের সেই আস্থার প্রতিদানও দিচ্ছেন সাইবারি।
বিশ্বকাপের আগে নেদারল্যান্ডসের ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটান তিনি। গত মৌসুমে ডাচ লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। তবে জাতীয় দলের হয়ে শুরুটা খুব একটা উজ্জ্বল ছিল না।
প্রথম ২৮ আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার গোল ছিল মাত্র ৭টি। অথচ সাম্প্রতিক চার ম্যাচেই তিনি করেছেন ৪ গোল। পিএসভির হয়ে অভিষেক মৌসুমও সহজ ছিল না তার জন্য। ২০২২-২৩ মৌসুমে চোটের কারণে খেলতে পেরেছিলেন মাত্র ১৭টি ম্যাচ। তবে সেই কঠিন সময় তাকে আরও পরিণত করেছে। গোলের সামনে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছিল সেই অভিজ্ঞতা।
২০২৩ সালে পিএসভির ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাইবারি বলেছিলেন, “আগে ভাবতাম, সুযোগ নষ্ট করা যাবে না। এখন ভাবি, আমি গোল করব।” সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার ফুটবলীয় দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাও বেড়েছে। তার প্রমাণ মিলেছে পরিসংখ্যানে। গত মৌসুমে ২৭ ম্যাচে ১৫ গোল করে পিএসভিকে টানা তৃতীয়বারের মতো ডাচ লিগের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
সাইবারির জীবনের বড় অংশ কেটেছে নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। স্পেনের তেরাসায় জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে বেলজিয়ামে চলে যান। স্থানীয় ক্লাবে খেলার পর ২০১৩ সালে যোগ দেন আন্ডারলেখটের একাডেমিতে।
তবে সেখানে পথচলা দীর্ঘ হয়নি। মাত্র দুই বছর পর নতুন মৌসুম শুরুর কয়েক দিন আগে ফর্মের ঘাটতির কারণে তাকে ছেড়ে দেয় ক্লাবটি। কিন্তু সেই ধাক্কাই তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে। একসময় তিনি বলেছিলেন, “এটি আমাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।”
জন্মসূত্রে স্পেন এবং নাগরিকত্বের কারণে বেলজিয়ামের হয়ে খেলার সুযোগ থাকলেও মরক্কোকেই বেছে নেন সাইবারি। ‘আটলাস লায়ন্স’ খ্যাত দলটির বাইরে অন্য কোনো দেশের হয়ে খেলার কথা কখনও ভাবেননি তিনি। সাইবারির ভাষায়, “জাতীয় দল বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হৃদয় থেকে আসা উচিত। কোথায় বেশি সুযোগ পাওয়া যাবে, সেই হিসাব থেকে নয়।
আপনি একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই আপনাকে হৃদয় দিয়ে খেলতে হবে।” বেলজিয়ামের সাবেক কোচ রবের্তো মার্তিনেস, যিনি বর্তমানে পর্তুগালের দায়িত্বে আছেন, সাইবারিকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মরক্কোর প্রতি নিজের অঙ্গীকারে কখনও টলেননি এই ফুটবলার। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল যাত্রার অংশ ছিলেন না সাইবারি।
তবে এবার সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তির স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
দলের ভেতরের ঐক্য এবং পারিবারিক বন্ধনই তাকে সেই স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সাইবারি বলেন, “আমাদের সবার লক্ষ্য এক, স্বপ্নও এক। মাঠের বাইরে আমরা একসঙ্গে হাসি, গল্প করি এবং কাজ করি। আমরা ঠিক একটি পরিবারের মতো।”
ডিসি/আপ্র/২০/৬/২০২৬