ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় নির্মাণাধীন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাতে কে বা কারা ভাস্কর্যের মাথায় জুতার মালা ঝুলিয়ে দেয়। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে এর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়। পরে দুপুরের দিকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থলে গিয়ে জুতার মালা সরিয়ে ফেলেন।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক নেতা মুক্তিযোদ্ধা কামালুজ্জামান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ভাস্কর্যে জুতার মালা ঝোলানো দেখতে পান। পরে সেটি অপসারণ করা হয়। তিনি জানান, কয়েক মাস আগেও নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করা হয়েছিল।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখে জানতে পারে। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
ঘটনাটি নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বৈঠক হয়। জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। রাতে কে বা কারা এ ন্যক্কারজনক কাজ করেছে, তা খুঁজে বের করা হবে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সুপারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ঝিনাইদহ তথা সারা দেশের গর্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করে তিনি বীরত্বের ইতিহাস রচনা করেছেন। এর আগে তাঁর নামে নির্মিত ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এবার জুতার মালা পরানোর ঘটনাও অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান বলেন, ভাস্কর্যটিতে বারবার হামলা হচ্ছে। তাঁর ধারণা, একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ওই গোষ্ঠী ভাস্কর্যটি ঝিনাইদহে স্থাপন করতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের অপশক্তির কর্মকাণ্ড উল্লেখ করে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু তোয়াব অপু এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরিয়ে অবমাননা করা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির ঘৃণ্য অপতৎপরতা। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান তিনি।
আগেও ভাঙচুর, এবার জুতার মালা
ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশপথে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের কাছে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক ও ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের সংযোগস্থলে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ভাস্কর্যটিতে ভাঙচুর চালানো হয়। এরপর চলতি বছরের ১৩ জুলাই থেকে আবারো ভাস্কর্যটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। ১৭ জুলাই পর্যন্ত সেই কাজ চলে। কী কারণে ভাস্কর্যটি ভাঙা হচ্ছে, তা জানতে চাওয়া হলেও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তখন কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। পরে ১৮ জুলাই ভাঙার কাজ স্থগিত করে জেলা প্রশাসন।
সম্প্রতি স্থাপনাটিতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিস্তম্ভ মেরামতের কাজ চলছে’ লেখা একটি ব্যানার টানানো হয়। এর মধ্যেই ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটল। পরপর এমন ঘটনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় বিভিন্ন মহলের মধ্যে ক্ষোভ আরো তীব্র হয়েছে।
সানা/আপ্র/৭/১০/২০২৬