গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

আবরার হত্যার সাত বছর----------------

মামলার চূড়ান্ত বিচার এখনো আপিল বিভাগে

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০০:৪৩ পিএম, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০২:১৩ এএম ২০২৬
মামলার চূড়ান্ত বিচার এখনো আপিল বিভাগে
ছবি

আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার এখনো শেষ হয়নি -ফাইল ছবি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার এখনো শেষ হয়নি। বিচারিক আদালত ও হাই কোর্টে দুই ধাপের বিচার শেষ হলেও আপিল বিভাগে মামলাটি এখনো শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ওঠেনি। ফলে কবে চূড়ান্তভাবে এ মামলার বিচার শেষ হবে, তা অনিশ্চিত।

তবে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো মুলতবি চাইবে না। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, আপিল বিভাগে সাধারণত মামলা সন-তারিখের ভিত্তিতে শুনানি হয়। প্রধান বিচারপতি অগ্রাধিকার দিলে এ মামলার শুনানি দ্রুত হতে পারে।

আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহর প্রত্যাশা, মামলাটি বিশেষ বিবেচনায় দ্রুত কার্যতালিকায় এনে বিচার শেষ করা হবে এবং দণ্ডিতদের সাজা কার্যকর করা হবে।

মামলার বর্তমান অবস্থা: বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে গত বছর হাই কোর্ট রায় দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ে সন্তুষ্ট থাকায় আপিল করেনি। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিল করেছেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন।

আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, আপিলের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী দুই পক্ষকে সারসংক্ষেপ জমা দিতে হয়। এরপর পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। পেপারবুক প্রস্তুত হলে চেম্বার জজের মাধ্যমে শুনানির জন্য মামলা নির্ধারণ করতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত চেম্বার আদালত থেকে কোনো সারসংক্ষেপ চাওয়া হয়নি এবং আপিল শুনানির বিষয়ে আসামিদের কাছ থেকেও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, মামলার প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক তৈরি হয়েছে। মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকলেও এখনো কার্যতালিকায় আসেনি। কবে শুনানি হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না।

তার ভাষ্য, আপিল বিভাগের মামলা সাধারণত সন-তারিখের ভিত্তিতে শুনানি হয়। তবে প্রধান বিচারপতি চাইলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোনো মামলা শুনতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার চেয়ে আসামিপক্ষের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ নেই।

বিচারের শুরু থেকে হাই কোর্টের রায়: ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবরার ফাহাদকে। এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ।

৩৭ দিনের তদন্ত শেষে ওই বছরের ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেন ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার বিচার শুরু হয়।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হাই কোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলার নথি হাই কোর্টে পাঠানো হয়, যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি আবরার হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স হাই কোর্টে পৌঁছায়। একই সঙ্গে আসামিরাও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে হাই কোর্টে শুনানি শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরে আসামিপক্ষও শুনানি করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষ হয়। ওই বছরের ১৬ মার্চ রায় ঘোষণা করেন হাই কোর্ট।

রায়ে বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। হাই কোর্ট বলেন, বিচারিক আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো উপাদান পাওয়া যায়নি। ফলে ডেথ রেফারেন্স মঞ্জুর এবং আসামিদের আপিল খারিজ করা হয়।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামিই বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। তারা হলেন- মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।

তাদের মধ্যে মোর্শেদ-উজ-জামান, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকেই পলাতক। আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান। কারা কর্তৃপক্ষ গত বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানায়।

‘মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে মুলতবি চাইবে না রাষ্ট্রপক্ষ’: হাই কোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতের সাজা বহাল থাকায় রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেনি বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এ মামলায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হলেন দণ্ড বা সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা। তারাই আপিল করেছেন। ফলে দ্রুত আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার প্রাথমিক দায়িত্বও তাদের।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কোনো মামলাতেই রাষ্ট্রপক্ষ বিলম্ব ঘটাতে চায় না। প্রত্যেক নাগরিকের দ্রুত বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আপিল বিভাগে এ মামলার শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের বিলম্ব ঘটাবে না এবং কোনো মুলতবি প্রার্থনাও করবে না। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত আলোচিত ঘটনা হওয়ায় এর বিচার দ্রুত হওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাবার আবেদন দ্রুত বিচার শেষ করার: আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, শুরু থেকেই সংশ্লিষ্টদের কাছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তির আবেদন জানিয়ে আসছেন তারা। লিখিত আবেদন না করলেও তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে মৌখিকভাবে এ বিষয়ে অনুরোধ করেছিলেন।

তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আমার আবেদন, যেন মামলাটি বিশেষ বিবেচনায় কার্যতালিকায় এনে বিচারকাজ সম্পন্ন করা হয়।”

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর আবরার ফাহাদকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক দেয়। এটি বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।

হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ: হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত: ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখার রায়ে হাই কোর্ট আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেন। রায়ে বলা হয়, ঘটনাটি আকস্মিক ছিল না। এর আগে ৫ অক্টোবর একটি সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে আবরারকে হত্যা করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের ২৭ নম্বর সাক্ষী বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ওবায়দুর রহমান রাফসান এবং ২২ নম্বর সাক্ষী মো. গালিবের সাক্ষ্যে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

রায়ে বলা হয়, আবরারকে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তবে কাউকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে পিটিয়ে মারার ক্ষেত্রে এমন কোনো কারণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও আদালত মন্তব্য করেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও ঘটনার সময় তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না, এমন কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। কয়েকজন আসামিকে আবরারকে মারধরে সরাসরি অংশ নিতে এবং অন্যদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তা দেখতে দেখা গেছে। তাদের কেউ আবরারকে উদ্ধারের চেষ্টা করেননি। ফলে তাদের উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে বলে হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের ৩১ নম্বর সাক্ষী চিকিৎসক সোহেল মাহমুদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায়ে বলা হয়, আবরারের শরীরের আঘাতের স্থানে রক্ত জমাট বেঁধেছিল এবং আঘাতগুলো ছিল প্রাণঘাতী ও নরহত্যামূলক।

রাষ্ট্রপক্ষের পঞ্চম সাক্ষী চিকিৎসক মো. মাসুদ এলাহীর সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে হাই কোর্ট বলেন, আবরার অজ্ঞান ছিলেন এবং যথাযথ চিকিৎসা বা যত্ন পেলে বেঁচে যেতে পারতেন- আসামিপক্ষের এমন দাবি মামলার প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক নয়। আবরারকে ঘটনাস্থলে হত্যা করা হয়নি বা অন্য কোথাও হত্যা করা হয়েছে- এমন দাবিও আসামিপক্ষ করেনি।

আসামিদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেন হাই কোর্ট।

এখন সেই রায়ের পরবর্তী ধাপ আপিল বিভাগে। সেখানে শুনানি শুরু এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা।
সানা/আপ্র/৭/১০/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ঢাকায় একদিনে ৪৪৭ জন গ্রেফতার, মামলা ৫৮
০৬ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকায় একদিনে ৪৪৭ জন গ্রেফতার, মামলা ৫৮

ঢাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় নিয়মিত অভিযানে ৪৪৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ৫৮টি মামলা হয়ে...

সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনের জামিন নাকচ
০৫ অক্টোবর ২০২৬

সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনের জামিন নাকচ

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আদালত। সোমবার...

বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনা সরাসরি সম্প্রচারের দাবি
০৫ অক্টোবর ২০২৬

বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনা সরাসরি সম্প্রচারের দাবি

বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ চুরি ও লুটপাট বন্ধে লাগেজ ব্যবস্থাপনার পুরো কার্যক্রম সরাসরি সিসিটিভিতে...

ইনুর ১০ বছরের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের আপিল
০৫ অক্টোবর ২০২৬

ইনুর ১০ বছরের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের আপিল

জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই