বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চলমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী দুটি কিস্তি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যেই প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত শর্ত পূরণে ধীরগতির কারণে সেই সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সময়মতো পর্যালোচনা মিশন না এলে এই অর্থ ছাড় কার্যত ঝুলে যেতে পারে।
ঋণের প্রতিটি কিস্তি ছাড়ের আগে নিয়ম অনুযায়ী পর্যালোচনা মিশন পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। তবে এবার বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ না হওয়ায় সংস্থাটি এখনো মিশন পাঠাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে জুনের মধ্যে ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেওয়া অর্থমন্ত্রী ও তার প্রতিনিধিদল যদি দ্রুত পর্যালোচনা মিশন পাঠাতে সংস্থাটিকে রাজি করাতে না পারেন, তাহলে চলতি অর্থবছরে এই অর্থ ছাড়ের সম্ভাবনা খুবই কম।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার বিকল্প অর্থায়নের পথও খুঁজছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভেতর থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ মোকাবিলায় এই অর্থ প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিদ্যমান ঋণের কিস্তি সময়মতো ছাড় হবে কিনা, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ৩ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। বাকি অর্থ ছাড় নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বাস্তবায়নের ওপর। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।
বিশেষ করে রাজস্ব খাত সংস্কারে উল্লেখযোগ্য স্থবিরতা রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠন এবং করনীতি ও প্রশাসন আলাদা করার উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একইভাবে কর অব্যাহতি কমানোর ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ব্যাংক খাতের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যকর হয়নি। বাজারভিত্তিক বিনিময় হার পুরোপুরি বাস্তবায়নেও ঘাটতি রয়েছে।
সাম্প্রতিক মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল উল্লেখ করেছে, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
রাজস্ব খাত সংস্কার নিয়ে নীতিগত অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ কার্যকর না হওয়ায় অন্যতম প্রধান শর্তই ঝুলে আছে। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভেঙে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আগামী বাজেট থেকেই ধাপে ধাপে করছাড় ও ভর্তুকি প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা হঠাৎ করে এসব সুবিধা তুলে দিলে বিনিয়োগ, রফতানি ও মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন। তাদের মতে, ধীরে ধীরে সংস্কারই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ।
বর্তমানে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করছাড় হ্রাস এবং জ্বালানি ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস-এই তিনটি বিষয়ে সংস্থাটি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারলে কিস্তি ছাড় পাওয়া কঠিন হবে।
আইএমএফের কিস্তি বিলম্বিত হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট সহায়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় চাপ বাড়তে পারে। পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের পরবর্তী কিস্তি এখন নীতিগত সংস্কার ও সময়সীমার এক জটিল দ্বন্দ্বে আটকে আছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সানা/আপ্র/১৭/৪/২০২৬