বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বহিঃখাতের চাপ মোকাবিলায় সরকার বিশেষ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ‘থ্রি-আর’ কৌশল গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে চাঁদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয় এবং সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
অর্থমন্ত্রী জানান, বহিঃখাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের এই কৌশল তিনটি ধাপে বিভক্ত—পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা, পুনর্গঠন এবং ত্বরান্বিত উন্নয়ন। এর মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া ও উত্তর মেসিডোনিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে বৈধ পথে পাঠানো অর্থে আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ও সারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভর্তুকি অব্যাহত রাখার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।
ব্যাংক হিসাব ছাড়াল উনিশ কোটির বেশি: দেশে ব্যাংকিং খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখের বেশি।
জাতীয় সংসদে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ব্যাংক হিসাব ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি এবং ঋণ হিসাব ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সব নাগরিককে আর্থিক সেবার আওতায় আনতে সরকার জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।
তিনি আরো জানান, এই কৌশলের বর্তমান পর্যায় ২০২৬ সালের জুনে শেষ হবে। এরপর ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, যার লক্ষ্য সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনা।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ: আগামী অর্থবছরে দেশে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বর্তমানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ।
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো আগামী বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি জানান, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নারীদের জন্য পরিবার কার্ডের মাধ্যমে মাসে ২৫০০ টাকা সহায়তা এবং কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ৫৫ লাখ পরিবারকে কর্মহীন মৌসুমে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা বিক্রি এবং উন্মুক্ত বাজার কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করা হবে।
বিদেশি ঋণ বাড়ায় দায় বৃদ্ধি সতর্কবার্তা: দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়ায় আগামী দিনে আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পাবে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাজেট অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ২শত ২৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ সহজ শর্তের ঋণ এবং ৩৮ দশমিক ০৩ শতাংশ অপেক্ষাকৃত কঠিন শর্তের ঋণ।
তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পর সহজ শর্তের ঋণের সুযোগ কমে গেছে। একই সঙ্গে ঋণ গ্রহণও বেড়েছে, ফলে ভবিষ্যতে পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্প যাচাই-বাছাই কঠোর করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। উচ্চ সুদের ঋণে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এড়ানো, উচ্চ অর্থনৈতিক সুফলযুক্ত প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরো জানান, মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল হালনাগাদ, ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সানা/আপ্র/২৪/৬/২০২৬