গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

দেশের খাদ্য ব্যবস্থা সচল রাখা কৃষকরা আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২০ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৩:০৯ এএম ২০২৬
দেশের খাদ্য ব্যবস্থা সচল রাখা কৃষকরা আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু জমি নয়- কৃষক। সীমিত জমি, বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয়, জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা ও বাজারের চাপের মধ্যেও তার শ্রম, অভিজ্ঞতা ও উৎপাদনক্ষমতা দেশের খাদ্য ব্যবস্থাকে সচল রাখে। অথচ কৃষকের বড় অংশ আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই বাস্তবতায় স্মার্ট কৃষক কার্ডকে শুধু সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা সীমিত হবে। এর প্রকৃত শক্তি হলো কৃষকের পরিচয়, ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়, উৎপাদন, ঋণ, বাজার, ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ অর্থায়নের তথ্যকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোয় আনা। আর কৃষি উপকরণ, সেচ, ঋণ, বীমা, প্রশিক্ষণ ও বাজারতথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছানো গেলে তা কার্যকর আর্থিক হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। এ বিষয় নিয়েই এবারের কৃষি ও কৃষক পাতার প্রধান ফিচার

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির আলোচনায় তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, রপ্তানি ও শিল্পায়ন যতটা গুরুত্ব পায়, কৃষির অবদান নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না। অথচ খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় কৃষির ভূমিকা গভীর। জিডিপিতে কৃষির অংশ কমা কাঠামোগত রূপান্তরের স্বাভাবিক ফল; এতে কৃষির গুরুত্ব কমে না। কৃষিকে তাই শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, আয়, কর্মসংস্থান, বাজার ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

কৃষির মৌলিক সমস্যা- ব্যয় আগে, আয় পরে। বীজ, সার, সেচ, শ্রম, কৃষিযন্ত্র, মাছের পোনা বা পশুখাদ্যের ব্যয় শুরুতেই করতে হয়; আয় আসে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির পর। এই সময়ের ব্যবধান পূরণ না হলে কৃষক মহাজন, আড়তদার বা উপকরণ সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাই সমস্যা শুধু ঋণের অভাব নয়; প্রয়োজন সঠিক কৃষকের কাছে, সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে ও ন্যায্য শর্তে অর্থ পৌঁছানো। তবে কার্ড থাকলেই স্বয়ংক্রিয় ঋণের অধিকার তৈরি হবে না। তথ্য যাচাই, পরিশোধক্ষমতা ও প্রযোজ্য নীতিমালার ভিত্তিতেই দায়িত্বশীল অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবায়নও ধাপে ধাপে হওয়া জরুরি।

প্রি-পাইলটিংয়ে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই, কৃষি-মৎস্য-প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাঠকর্মীদের সম্পৃক্ততা, অনুমোদিত তালিকার ভিত্তিতে ব্যাংকের মাধ্যমে কার্ড প্রস্তুত ও সক্রিয়করণ এবং চঙঝ ব্যবস্থার ব্যবহার- এসবকে সমন্বিত করা দরকার। মাঠের অভিজ্ঞতা, ভুল-ত্রুটি ও কৃষকের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করে পাইলটিং এবং পরে পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা উচিত। এতে কার্ড বিতরণ একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি না হয়ে তথ্য, ব্যাংকিং ও কৃষিসেবার সমন্বিত ব্যবস্থায় রূপ নেবে।

গ্রামীণ অর্থনীতি শুধু ফসল উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। মাছ চাষ, গবাদিপশু, দুধ, ডিম, হাঁস-মুরগি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কার্ডভিত্তিক ব্যবস্থাকে সমগ্র কৃষি ও গ্রামীণ উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকের আয় যেন শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে, মূল্য সংযোজন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও স্থানীয় উদ্যোক্তা কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত হয়- সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।

কৃষির আরেক বাস্তবতা হলো ঝুঁকি। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, খরা ও অতিবৃষ্টি উৎপাদন ও আয়কে সরাসরি আঘাত করে। তাই দুর্যোগের কারণে কৃষককে অর্থায়ন থেকে বাদ না দিয়ে তার ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী অর্থায়ন ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। উৎপাদন ও ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য তথ্য ভবিষ্যতে কৃষি বীমা বা অন্যান্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযোগ তৈরির সুযোগ দিতে পারে। দুর্যোগের পর পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে কৃষকের জন্য পুনঃঅর্থায়ন, নমনীয় পরিশোধসূচি বা উপযুক্ত সহায়তাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কার্ডটি নয়; নির্ভরযোগ্য তথ্য। কৃষককে জানতে হবে তার নামে কী তথ্য সংরক্ষিত আছে, কেন তা ব্যবহার করা হচ্ছে, কারা ব্যবহার করতে পারবেন এবং ভুল হলে কীভাবে সংশোধন করা যাবে। তথ্যনির্ভর ব্যবস্থা যেন তথ্যনির্ভর বৈষম্যে পরিণত না হয়। সাময়িক দুর্যোগ, বাজারধস বা ভুল তথ্য যেন একজন কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিচয়কে অন্যায্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। প্রয়োজন কার্যকর অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাও।

কার্ডে ভুল তথ্য, ব্যাংক হিসাবের অসঙ্গতি, ঋণ না পাওয়া বা প্রাপ্য সুবিধা না পাওয়ার কারণে কৃষককে যেন একাধিক প্রতিষ্ঠানের দরজায় ঘুরতে না হয়। এক কৃষক, এক পরিচয়, এক অভিযোগের পথ এবং অনুসরণযোগ্য প্রতিকার ব্যবস্থা- এটি একটি কার্যকর নীতি হতে পারে। প্রযুক্তি সেবা সহজ করলেও নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ, সার্ভার বা প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার কারণে কৃষকের অধিকার যেন থেমে না যায়। বিকল্প প্রক্রিয়া ও মানবিক সহায়তাও থাকতে হবে। এখানে ব্যাংকের ভূমিকাও নতুনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সম্পর্ক শুধু ঋণ বিতরণ ও কিস্তি আদায়ে সীমিত না থেকে কৃষকের উৎপাদন, অর্থের প্রয়োজনের সময়, আয়, সঞ্চয়, ঝুঁকি ও পরিশোধ ক্ষমতা কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংককে কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অংশীদার হতে হবে। শাখাকে শুধু ঋণ বিতরণ ও আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে নয়, কৃষকের আর্থিক পরামর্শ, সঞ্চয়, ঋণ, বাজার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও ভাবা যেতে পারে।

বর্তমান সরকারের জন্য কৃষক কার্ড শুধু একটি নতুন কর্মসূচি নয়; গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। প্রকৃত কৃষকের নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক পরিচয় তৈরি করে তার সঙ্গে ঋণ, উপকরণ, বীমা, বাজারতথ্য, সংরক্ষণ ও অন্যান্য সেবা যুক্ত করা গেলে রাষ্ট্রীয় সেবা আরও লক্ষ্যভিত্তিক হতে পারে। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি বর্তমান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সাফল্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে কৃষকের জীবনে এর পরিমাপযোগ্য ফলাফল। এই পরিবর্তনকে দেখতে হবে একটি ধারাবাহিকতায়- সহজ ব্যাংকিং থেকে প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন, সেখান থেকে উৎপাদন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা, তারপর আয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত আর্থিক স্থিতিশীলতা। এর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অনুপস্থিত থাকলে শুধু প্রযুক্তিগত কাঠামোর সাফল্য কৃষকের জীবনে কাক্সিক্ষত ফল আনবে না।

কার্ডের সঙ্গে সেবা, সেবার সঙ্গে অর্থায়ন এবং অর্থায়নের সঙ্গে উৎপাদন ও বাজারের সংযোগই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের ভিত্তি। ‘কার্ডের মাধ্যমে কতটা পরিবর্তন?’ একজন কৃষক কার্ড পাওয়ার পরও যদি প্রয়োজনের সময়ে অর্থ না পান, সঞ্চয় গড়ে তুলতে না পারেন, উৎপাদন বাড়াতে না পারেন বা বাজারে বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে কার্ড বিতরণের সংখ্যা বড় হলেও প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হয়নি। কার্ড হাতে তুলে দেওয়া সহজ; কঠিন হলো এর মাধ্যমে কৃষকের হাতে সময়মতো অর্থ, সঞ্চয়ের শক্তি, উৎপাদনের সক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলার সামর্থ্য পৌঁছে দেওয়া। ‘কার্ডটি কতটা স্মার্ট- তা নয়; কার্ডের কারণে কৃষকের জীবন কতটা স্মার্ট, নিরাপদ ও সক্ষম হলো?’ এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তরই হবে উদ্যোগটির প্রকৃত সাফল্য। তখন এটি আর একটি কার্ড থাকবে না- এটি হয়ে উঠবে কৃষকের অর্থনৈতিক পরিচয়, উৎপাদনক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি জীবন্ত সেতু; একই সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, কৃষি অর্থায়ন ও তথ্যনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন ভিত্তি।

কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান
২৬ অক্টোবর ২০২৬

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান

মোঃ আকরাম হোসেন: রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তুলতে টাঙ্...

প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান

বাংলাদেশের কৃষি এখন আর কেবল লাঙল, গরু ও প্রচলিত কৃষি জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল নয়। আধুনিক জাত, যান্ত্রিক...

ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ
২৫ অক্টোবর ২০২৬

ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ

লাউয়ের বাগানে ফলন হয়েছে প্রচুর, পেঁপে গাছেও ঝুলছে পাকা ফল। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ক্রেত...

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা

রাজশাহীর দুর্গাপুরের মাঠে এবার দেখা মিলেছে ব্যতিক্রমী এক ধানের। প্রচলিত সোনালি ধানের পাশাপাশি জমিতে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে