গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৪৫ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫২ এএম ২০২৬
প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের কৃষি এখন আর কেবল লাঙল, গরু ও প্রচলিত কৃষি জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল নয়। আধুনিক জাত, যান্ত্রিকীকরণ, সেচব্যবস্থা, কৃষি উপকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাব কৃষিতেও স্পষ্ট। এখন মাটির তথ্য সংগ্রহ করে সার ব্যবস্থাপনা ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবহারে কৃষি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এ ছাড়া ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় শনাক্ত করার প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে। বিগ ডেটা কৃষির বৃহৎ পরিসরের তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করছে। কৃষিপণ্য বিপণনেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান ঘটায়নি; বরং সংগ্রামের ধরন পরিবর্তন করেছে। এ  বিষয় নিয়েই এবারের কৃষি ও কৃষক পাতার প্রধান ফিচার

বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে কৃষকের জীবন ও সংগ্রাম গভীরভাবে জড়িত। এই ভূখণ্ডের মানুষের খাদ্য, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ভিত্তি গড়ে উঠেছে কৃষিকে কেন্দ্র করে। অথচ যুগের পর যুগ কৃষককে তার উৎপাদিত ফসল, শ্রম ও অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করতে হয়েছে। কখনো জমির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, কখনো খাজনা ও শোষণের বিরুদ্ধে, কখনো ন্যায্য মজুরি ও ফসলের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে, আবার কখনো কৃষি উপকরণের ন্যায্য প্রাপ্যতার জন্য কৃষককে পথে নামতে হয়েছে। সেই সংগ্রামের ইতিহাসে আছে আন্দোলন, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ এবং অনেক মানুষের জীবন বিসর্জনের ঘটনাও। কৃষকের এই সংগ্রাম কেবল অর্থনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম নয়; এটি মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কৃষক যখন মাঠে বীজ বপন করেন; তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন না, একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ভিত্তিও নির্মাণ করেন। তাই কৃষকের অধিকার রক্ষা মূলত দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষারই অংশ।

উপমহাদেশের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। জমিদারি ও ঔপনিবেশিক শোষণ, অতিরিক্ত খাজনা, ফসলের ওপর অন্যায্য দাবি এবং জমির অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে কৃষক বিদ্রোহ ও আন্দোলন হয়েছে। নীল চাষের বিরুদ্ধে কৃষকের প্রতিরোধ থেকে শুরু করে তেভাগা আন্দোলন, নানামুখী কৃষক আন্দোলন, প্রতিটি ঘটনাই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে- কৃষককে দীর্ঘদিন অবহেলা করা গেলেও তার অধিকারবোধকে চিরদিন দমিয়ে রাখা যায় না। ইতিহাসের অনেক পরিবর্তনের পেছনে সম্মিলিত কৃষক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তাই কৃষকের সংগ্রাম আমাদের শেখায়, উৎপাদনকারী মানুষের অধিকার উপেক্ষা করে কোনো সমাজ দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ হতে পারে না।

বর্তমান সময়ে কৃষকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম হলো সঠিক তথ্য ও জ্ঞান পাওয়ার অধিকার। কৃষিতে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক বেশি। ভুল জাত নির্বাচন, ভুল সময়ে বীজ বপন, অতিরিক্ত সার প্রয়োগ, অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার কিংবা রোগ-পোকা সম্পর্কে ভুল পরামর্শ, এসবের কারণে কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। একসময় কৃষক প্রধানত অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতেন। এখন সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য যুক্ত করা জরুরি। কৃষককে এমন একটি কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা দিতে হবে; যেখানে তিনি দ্রুত, নির্ভরযোগ্য এবং সহজবোধ্য কৃষি পরামর্শ পাবেন। ডিজিটাল কৃষি এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। স্মার্টফোন, এআই, আইওটি, আবহাওয়া তথ্য, মাটির তথ্য এবং ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাকে কৃষকের হাতের নাগালে নিয়ে যেতে পারলে কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়বে। তখন কৃষক শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী থাকবেন না; তিনি হয়ে উঠবেন তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী উদ্যোক্তা।

বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রামে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খরা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং নতুন ধরনের রোগ-পোকার আক্রমণ কৃষির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কৃষক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তার দায় সবচেয়ে কম। তাই অভিযোজনের দায়ও শুধু কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। জলবায়ু সহনশীল জাত, পানি ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, ফসল বৈচিত্র্য, কৃষি বিমা, আগাম সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় আবহাওয়া তথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। কৃষকের ভবিষ্যৎ সংগ্রাম তাই শুধু বেশি উৎপাদনের জন্য নয়; কম ঝুঁকিতে, কম খরচে এবং পরিবেশ রক্ষা করে উৎপাদনের জন্যও।

কৃষকের সংগ্রামকে আমরা অনেক সময় শুধু রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কৃষকের সংগ্রামের অর্থ আরও বিস্তৃত। সঠিক তথ্য জানা একটি সংগ্রাম। বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি সংগ্রাম। ন্যায্যমূল্য দাবি করা একটি সংগ্রাম। মানসম্মত বীজ ও কৃষি উপকরণ পাওয়া একটি অধিকার। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা একটি সংগ্রাম। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানোও একটি সংগ্রাম। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা একটি সামাজিক দায়িত্ব। ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়াও কৃষকের ক্ষমতায়নের অংশ। অর্থাৎ কৃষকের সংগ্রাম এখন আর কেবল ‘দাবি আদায়ের’ সংগ্রাম নয়; এটি জ্ঞান, প্রযুক্তি, বাজার, পরিবেশ ও মর্যাদার ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কৃষককে আমরা কীভাবে দেখি তার ওপর। কৃষককে যদি শুধু খাদ্য উৎপাদনকারী হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে। কৃষক একজন উদ্যোক্তা। তিনি জমি, শ্রম, পুঁজি, প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে মূল্য সৃষ্টি করেন। তাই তাকে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলে শক্তিশালী করতে হবে। কৃষকের হাতে তথ্য থাকলে তিনি ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ডিজিটাল বাজারে প্রবেশাধিকার থাকলে তিনি ক্রেতা খুঁজে নিতে পারবেন। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ থাকলে তিনি বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করবেন না। কৃষি ঋণ, বীমা ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা থাকলে ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়বে।

কৃষকের সংগ্রামের ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির ইতিহাসেরই আরেক নাম। কৃষক যতবার প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, ততবার দেশের খাদ্য ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। আজ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, কৃষককে সংগ্রাম করতে বাধ্য করার কারণগুলো কমিয়ে আনা। এমন একটি কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা- যেখানে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, সঠিক তথ্য পাবেন, মানসম্মত উপকরণ পাবেন, প্রযুক্তির সুবিধা পাবেন এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর সহায়তা পাবেন।

আজও কৃষকের সংগ্রাম চলছে। তবে ওই সংগ্রামের ভাষা ও ধরন বদলেছে। এক সময় কৃষক জমির অধিকার ও খাজনার বিরুদ্ধে লড়েছেন; আজ তিনি ন্যায্যমূল্য, উৎপাদন খরচ, জলবায়ু ঝুঁকি, মানসম্মত উপকরণ, সঠিক কৃষি তথ্য এবং প্রযুক্তিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকারের জন্য লড়ছেন। আগামী দিনের কৃষক হয়তো রাজপথে কম। কিন্তু তথ্যের পর্দায়, ডিজিটাল বাজারে, প্রযুক্তির মাঠে এবং ন্যায্যতার দাবিতে আরও বেশি সক্রিয় থাকবেন। তার হাতে থাকবে স্মার্টফোন, মাটির তথ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, এআই-ভিত্তিক পরামর্শ এবং বাজারের তথ্য। কিন্তু প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, কৃষকের মূল দাবি একই থাকবে, শ্রমের মর্যাদা, উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ। কৃষকের সংগ্রাম থামবে না; থামবে শুধু বঞ্চনা। কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই সমৃদ্ধ হবে কৃষি, শক্তিশালী হবে অর্থনীতি, নিরাপদ হবে খাদ্য এবং এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

কেএমএএ/আপ্র/২৫.১০.২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ
২৫ অক্টোবর ২০২৬

ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ

লাউয়ের বাগানে ফলন হয়েছে প্রচুর, পেঁপে গাছেও ঝুলছে পাকা ফল। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ক্রেত...

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা

রাজশাহীর দুর্গাপুরের মাঠে এবার দেখা মিলেছে ব্যতিক্রমী এক ধানের। প্রচলিত সোনালি ধানের পাশাপাশি জমিতে...

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই ২৫ জাতের ধান উদ্ভাবক সেন্টু হাজং
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই ২৫ জাতের ধান উদ্ভাবক সেন্টু হাজং

আধুনিক গবেষণাগার কিংবা উন্নত প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন শ...

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান
২৫ অক্টোবর ২০২৬

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান

মোঃ আকরাম হোসেন, টাঙ্গাইল: রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই