গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৪৩ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫৩ এএম ২০২৬
ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ
ছবি

ছবি সংগৃহীত

লাউয়ের বাগানে ফলন হয়েছে প্রচুর, পেঁপে গাছেও ঝুলছে পাকা ফল। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ক্রেতার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় এসব সবজির দাম নেমেছে তলানিতে। কোথাও চারটি লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র এক টাকায় আবার কোথাও এক কেজি পেঁপের দাম দুই থেকে তিন টাকা। এমন পরিস্থিতিতে ফসল তোলা, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। লোকসান কমাতে কোনও কৃষক লাউয়ের গাছ কেটে ফেলছেন, কেউ বা পেঁপে না তুলেই নষ্ট হতে দিচ্ছেন। অথচ রাজধানীর খুচরা বাজারে একটি লাউয়ের দাম ৪০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। পেঁপেও বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ৩০ টাকায়। উৎপাদনস্থল থেকে রাজধানীর বাজার পর্যন্ত দামের এই বিশাল ব্যবধান কৃষকের দুরবস্থা এবং কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় এবার লাউয়ের ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাজারে প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। কোনও এলাকায় চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও প্রতিটি লাউয়ের দাম দুই থেকে পাঁচ টাকা। অথচ স্থানীয় খুচরা বাজারে একটি লাউ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।

উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষে বিনিয়োগ করেছিলেন ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন পর্যন্ত উৎপাদিত লাউ বিক্রি করে তার আয় হয়েছে মাত্র তিন হাজার টাকা।

দুলাল ইসলামের ভাষ্য- বিক্রির টাকা দিয়ে শ্রমিকের মজুরিও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনার সমপরিমাণ অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে তিনি বাগান কেটে ফেলেছেন। কিছু লাউ গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার প্রশ্ন, এত পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করে ফসল উৎপাদনের পরও যদি কৃষক ন্যায্য দাম না পান, তাহলে ভবিষ্যতে চাষাবাদ চালিয়ে যাবেন কীভাবে?

একই উপজেলার ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার কৃষক আনসারুল ইসলামও লোকসানের চাপে লাউয়ের বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন। তার মতে, সার ও কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। একজন শ্রমিককে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয়। অথচ লাউ বিক্রি করে মিলছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পর্যন্ত। এই দামে বাগানের পরিচর্যা অব্যাহত রাখলে লোকসান আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

লাউয়ের মতো পেঁপে চাষিরাও পড়েছেন বিপাকে। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় এবার প্রায় ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। অনুকূল আবহাওয়া, উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার এবং চাষের জমি বাড়ায় উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে বাজারে বিপুল পরিমাণ পেঁপে আসায় দাম কমে গেছে ব্যাপকভাবে।

সিংগাইরের বিভিন্ন এলাকায় জমি থেকেই প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন টাকায়। এই দামে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, জমির ভাড়া ও শ্রমিকের খরচ তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক গাছ থেকে পেঁপে সংগ্রহ করছেন না। কোথাও পাকা ফল গাছেই নষ্ট হচ্ছে, আবার কোথাও পেঁপের বাগান সরিয়ে অন্য ফসল চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকরা।

উপজেলার গোপালনগর গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন দুই বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। কিন্তু বিক্রির সময় ক্রেতারা কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকার বেশি দিতে চাইছেন না। তার মতে, এই দামে পেঁপে বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরি ও ভ্যানভাড়াই মেটানো কঠিন। একই উপজেলার কৃষক তাজুল সিকদার লোকসান সামাল দিতে দুই বিঘা জমির পেঁপেগাছ কেটে ফেলেছেন। উৎপাদন খরচের সামান্য অংশও বিক্রি থেকে ফেরত না পাওয়ায় এখন বিকল্প ফসল চাষের কথা ভাবছেন তিনি। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে পেঁপে চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পেঁপের দাম কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে পাইকার ও আগাম অর্থ বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীদের ওপরও। ঢাকার পাইকারি বাজারে এক সপ্তাহ ধরে কাঁচা পেঁপে কেজিপ্রতি চার থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে খুচরা বাজারে পেঁপের দাম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। 
কারওয়ান বাজারের পেঁপে ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান গত বছর ভালো দাম পাওয়ার অভিজ্ঞতায় এবার পাঁচ জেলার কৃষকদের অগ্রিম তিন কোটি টাকা দিয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল, এবারও বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাবে। কিন্তু দাম পড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, কয়েকদিন ধরে পেঁপে কেজিপ্রতি ছয় থেকে সাত টাকায় বিক্রি করেছেন। পরে দাম আরও কমে চার টাকায় নেমে আসে। অথচ চুয়াডাঙ্গা ও যশোর থেকে ঢাকায় পেঁপে পরিবহন করতেই কেজিপ্রতি চার টাকার বেশি ব্যয় হয়। এর অবস্থায় কৃষকদের কাছ থেকে অগ্রিম দেওয়া তিন কোটি টাকার মধ্যে ৫০ লাখ টাকাও ফেরত পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। ব্যাংকঋণ ও সুদের অর্থ পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এই ব্যবসায়ী।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর থেকে তিন টন পেঁপে নিয়ে কারওয়ান বাজারে এসেছিলেন অজি উল্যাহ। তার হিসাব অনুযায়ী, জমির ভাড়া, বীজ ও সারসহ উৎপাদন খরচ পড়ে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ যোগ হলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অথচ বাজারে পেঁপে বিক্রি করতে হয়েছে কেজিপ্রতি ছয় থেকে আট টাকায়। ফলে প্রতিটি কেজিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লোকসান গুনতে হয়েছে তাকে।

কেএমএএ/আপ্র/২৫.১০.২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান

বাংলাদেশের কৃষি এখন আর কেবল লাঙল, গরু ও প্রচলিত কৃষি জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল নয়। আধুনিক জাত, যান্ত্রিক...

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা

রাজশাহীর দুর্গাপুরের মাঠে এবার দেখা মিলেছে ব্যতিক্রমী এক ধানের। প্রচলিত সোনালি ধানের পাশাপাশি জমিতে...

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই ২৫ জাতের ধান উদ্ভাবক সেন্টু হাজং
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই ২৫ জাতের ধান উদ্ভাবক সেন্টু হাজং

আধুনিক গবেষণাগার কিংবা উন্নত প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন শ...

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান
২৫ অক্টোবর ২০২৬

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান

মোঃ আকরাম হোসেন, টাঙ্গাইল: রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই