গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢল হাওরজুড়ে সর্বনাশা বিপর্যয়

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:৪৫ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১১:১৭ এএম ২০২৬
টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢল  হাওরজুড়ে সর্বনাশা বিপর্যয়
ছবি

কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে -ছবি সংগৃহীত

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল, আকস্মিক বন্যা ও ঝড়-সব মিলিয়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে নেমে এসেছে বহুমাত্রিক দুর্যোগ। কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কাটা ধান মাঠেই ভিজে নষ্ট হচ্ছে, কোথাও পাকা ফসল ঘরে তোলার আগেই ডুবে যাচ্ছে। পানিবন্দি হাজারো মানুষ, নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। একই সময়ে রাজধানী ঢাকায়ও বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতায় জনজীবন বিপর্যস্ত। সার্বিক পরিস্থিতিতে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও নগরজীবনে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।

তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান, চোখের সামনে স্বপ্নভঙ্গ: কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরে বোরো ধান তলিয়ে গেছে। চার দিন আগেও যেখানে ধান বাতাসে দুলছিল, সেখানে এখন থৈথৈ পানি। টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদী উপচে পানি হাওরে ঢুকে পড়েছে। অনেক জায়গায় কোমরসমান পানি জমে গেছে, ফলে ধান কাটা কার্যত বন্ধ। অষ্টগ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম জানান, শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান কাটতে না পারায় অধিকাংশ ফসল পানির নিচে চলে গেছে। কৃষকদের ভাষায়, আর দুই-তিন দিনের মধ্যে ধান না কাটতে পারলে পুরো ফসল পচে যাবে।

রেকর্ড বৃষ্টিতে পরিস্থিতি ভয়াবহ, বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ: নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্যে, ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, পরবর্তী সময়েও ৯১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। চার দিনের টানা বর্ষণে কিশোরগঞ্জের প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা দিন দিন বাড়ছে।

আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরো কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে হাওরের নিম্নাঞ্চল পুরোপুরি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঋণের বোঝা, খাদ্যসংকট-বেঁচে থাকার লড়াই কৃষকের: অষ্টগ্রামের কৃষক ফুল মিয়ার ১০ একর জমির ধান পানির নিচে। যে ফসল দিয়ে সারা বছর সংসার চলার কথা ছিল, তা হারিয়ে তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তায়। একইভাবে কামরুল ইসলাম দেড় একর জমির ধান হারিয়ে ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায়।
বেলাল ভূঁইয়া জানান, হাজার হাজার একর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় পুরো হাওরাঞ্চল খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। কৃষকদের দাবি, হাওর রক্ষা বাঁধ না থাকায় প্রতি বছরই এমন দুর্যোগে পড়তে হচ্ছে।

হবিগঞ্জে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে: হবিগঞ্জের বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদীর পানি বেড়ে হাওরে ঢুকে পড়েছে। যেসব কৃষক ধান কাটতে পেরেছেন, তাদের ফসলও মাঠে ভিজে যাচ্ছে। রোদ না থাকায় শুকিয়ে গোলায় তোলা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি বিভাগ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠে কাজ করছে এবং আরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে।

পানির নিচে নেমে ধান কাটার মরিয়া চেষ্টা: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জীবনঝুঁকি নিয়ে কোমরসমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। লাখাইয়ের কৃষক রফিক মিয়া জানান, তার আট বিঘা জমির সব ধান ডুবে গেছে। নবীগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জের কৃষকরাও একই দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। অনেক জায়গায় খলায় রাখা ধানও বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে। এতে স্থানীয়ভাবে এক ধরনের মানবিক সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মৌলভীবাজারে আকস্মিক বন্যা, পানিবন্দি হাজারো মানুষ: মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও সদর উপজেলায় আকস্মিক বন্যায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কুলাউড়ায় প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রাম পানির নিচে চলে গেছে।
সদর উপজেলার আখাইলকুড়া এলাকায় নদীভাঙনে কবরস্থান, মক্তব ও বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কমলগঞ্জ ও রাজনগরেও নদীর পানি উপচে রাস্তাঘাট ও বসতবাড়িতে পানি ঢুকেছে। এতে গবাদিপশু ও সম্পদ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মানুষ। জেলা প্রশাসন ১১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং ত্রাণ হিসেবে চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।

বৃষ্টি-ঢলে ডুবে পাকা ধান, কৃষকের দিশাহারা অবস্থা: মৌলভীবাজারে হাওর ও নন-হাওর-উভয় এলাকায় পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জেলার ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমির বড় অংশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। হাওরে ৮৩ শতাংশ ধান কাটা হলেও নন-হাওর এলাকায় মাত্র ১৭ শতাংশ কাটা হয়েছে। ফলে অধিকাংশ পাকা ধান এখন পানির নিচে। কৃষকরা ঋণের বোঝা ও খাদ্য সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাজার বিঘা জমি তলিয়ে ক্ষতির শঙ্কা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে টানা বৃষ্টিতে উজানের ঢলে প্রায় হাজার বিঘা জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। লঙ্গন, বেমালিয়া, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীর পানি দ্রুত বেড়ে হাওরে ঢুকে পড়ায় মুহূর্তেই ফসল নষ্ট হয়েছে। কৃষকেরা কোমরসমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। অধিকাংশই ঋণ নিয়ে আবাদ করায় ফসল হারিয়ে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত শত শত ঘরবাড়ি: মৌলভীবাজারে কালবৈশাখী ঝড়ে ৮৫৫টি কাঁচা ও আধপাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার সাতটি উপজেলায় এই ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকায় জলাবদ্ধতায় স্থবির নগরজীবন: রাজধানীর মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, ধানমণ্ডি, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যানবাহন ধীরগতিতে চলেছে এবং মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে। সিটি কর্পোরেশন পানি নিষ্কাশনে পাম্প চালু করেছে। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দিনভর মেঘলা আকাশের সঙ্গে দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

গভীর সংকট: টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল, বন্যা ও ঝড়-সব মিলিয়ে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। হাওরে ফসলহানি, গ্রামে বন্যা, শহরে জলাবদ্ধতা-সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। কৃষক ও দুর্গত মানুষের দাবি-দ্রুত ত্রাণ সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি হাওর রক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই সংকট প্রতি বছরই আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
সানা/আপ্র/২৯/৪/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান
২৬ অক্টোবর ২০২৬

আর্থিক সংকটে ঘাটাইলের সম্ভাবনাময় জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান

মোঃ আকরাম হোসেন: রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তুলতে টাঙ্...

প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ঘটাতে পারেনি কৃষকের সব সংগ্রামের অবসান

বাংলাদেশের কৃষি এখন আর কেবল লাঙল, গরু ও প্রচলিত কৃষি জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল নয়। আধুনিক জাত, যান্ত্রিক...

ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ
২৫ অক্টোবর ২০২৬

ফলনের তুলনায় লাউ-পেঁপের পড়তি দামে কৃষকের উঠছে না খরচ

লাউয়ের বাগানে ফলন হয়েছে প্রচুর, পেঁপে গাছেও ঝুলছে পাকা ফল। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ক্রেত...

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা
২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রথমবার কালো ধান চাষে কৃষকের আয় বৃদ্ধির আশা

রাজশাহীর দুর্গাপুরের মাঠে এবার দেখা মিলেছে ব্যতিক্রমী এক ধানের। প্রচলিত সোনালি ধানের পাশাপাশি জমিতে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পুলিশকে শক্তিশালী না করলে দিনে-রাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলা যাবে না

পুলিশকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির, পিপিএম বলেছেন, “আপনারা সাংবাদিক ভাইয়েরা পুলিশকে ব্যবহার করেন। পুলিশকে শক্তিশালী না করলে আমরা সমাজে দিনে-রাতে কেউই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারব না।” রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাগেরহাট পুলিশ লাইনে জেলা পুলিশের আয়োজনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন আইজিপি সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 3 দিন আগে