গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মেনু

প্লাস্টিক দূষণে বিপর্যস্ত পরিবেশ

হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫২ পিএম, ০৫ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২২:১০ এএম ২০২৬
হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য
ছবি

নগরীর ড্রেন থেকে গ্রামীণ খাল, কৃষিজমি থেকে নদী, এমনকি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন পর্যন্ত প্লাস্টিক দূষণের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রা লাভ করেছে -ছবি সংগৃহীত

এক সময় প্লাস্টিককে আধুনিক জীবনের আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। হালকা, সস্তা, টেকসই এবং বহুমুখী ব্যবহারের কারণে এটি দ্রুত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই প্লাস্টিকই এখন পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বের অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নগরীর ড্রেন থেকে গ্রামীণ খাল, কৃষিজমি থেকে নদী, এমনকি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন পর্যন্ত প্লাস্টিক দূষণের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রা লাভ করেছে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে দেশে পরিবেশগত ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য ও শিল্প দূষণের সম্মিলিত প্রভাবে হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থা।

বাড়ছে প্লাস্টিকের বিস্তার: পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ ৯৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। দেশের কঠিন বর্জ্যের উল্লেখযোগ্য অংশই প্লাস্টিক। বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর হিসাব বলছে, বছরে প্রায় ৮৭ হাজার টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক উৎপাদিত হচ্ছে।

পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে এর ব্যবহার কমেনি। বরং নগরায়ণ, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং সহজলভ্যতার কারণে প্লাস্টিকের ব্যবহার আরো বিস্তৃত হয়েছে।

পরিবেশবিদদের ভাষ্য, প্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি প্রকৃতিতে সহজে বিলীন হয় না। শত শত বছর ধরে ভেঙে অতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরে জমা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব হুমকি: গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন নদী, সমুদ্র, পানীয় জল, মাছ, লবণ, এমনকি মানুষের রক্ত, গর্ভফুল ও মাতৃদুগ্ধেও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিকে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, হৃদরোগ, হরমোনজনিত জটিলতা, থাইরয়েড সমস্যা, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

খোলা জায়গায় প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বায়ুতে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

নদী ও জলাভূমিতে প্লাস্টিকের দখল: দেশের বিভিন্ন নদী, খাল ও জলাভূমিতে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীতে জমা হওয়া প্লাস্টিক শুধু পানি দূষণই ঘটায় না, বরং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্য ও আবাসস্থল ধ্বংস করে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে বহন করে নিয়ে যায়, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।

সুন্দরবনে বাড়ছে দূষণের চাপ: প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো এর প্রভাব সুন্দরবনের ওপর। পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, বনাঞ্চলসংলগ্ন নদী ও জলপথে জমা হওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য ধীরে ধীরে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলা, পশুর ও রূপসা নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে চিংড়িজাতীয় মাছের মধ্যে এ দূষণের মাত্রা বেশি।

প্লাস্টিক দূষণের পাশাপাশি শিল্প বর্জ্য, নৌযান চলাচল, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি সুন্দরবনের ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এসব কারণে বনের জীববৈচিত্র্য ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জীববৈচিত্র্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি: আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) সুন্দরবনের বেশ কয়েকটি প্রাণীকে মহাবিপন্ন বা বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভোঁদড়, কচ্ছপ, শকুন, ইরাবতী ডলফিন ও শুশুকসহ বহু প্রাণী ইতোমধ্যে পরিবেশগত চাপের মুখে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সামুদ্রিক ও জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে তাদের প্রজনন, বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক জীবনচক্রকে ব্যাহত করছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামুদ্রিক কচ্ছপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যুর সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পায়নের প্রভাব: সুন্দরবনের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন। উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বনাঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ছে, যা অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে শিল্পায়নের বিস্তার, নদীপথে ভারী নৌযান চলাচল এবং শিল্পবর্জ্য নিঃসরণ বনাঞ্চলের প্রতিবেশগত ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করছেন।

সমাধানের পথ কোথায়: বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় শুধু আইন বা নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাট, বাঁশ, বেত, কাচ, কাপড় ও কাগজনির্ভর পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কুটিরশিল্প ও সবুজ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।

পরিবেশবিদদের ভাষায়, প্লাস্টিক দূষণ এখন কেবল পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, শিল্পখাত এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো গভীর পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল বার্তাও তাই-প্লাস্টিক দূষণ কমাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য এ লড়াইয়ে সবাইকে অংশ নিতে হবে।

সানা/কেএমএএ/আপ্র/৫/৬/২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

অভিমান, অভাব আর সুরের ভেতর বেঁচে থাকা লাইলী বেগম
২৮ মে ২০২৬

অভিমান, অভাব আর সুরের ভেতর বেঁচে থাকা লাইলী বেগম

শহরের ভিড়ভাট্টা অলিগলি, ধুলোমাখা পথ আর রাতের নিঃশব্দ আকাশের নিচে এক নারী ঘুরে বেড়ান কাঁধে একটি থলে ন...

গোলাপি মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ঘিরে কৌতূহল
১২ মে ২০২৬

গোলাপি মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ঘিরে কৌতূহল

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে গোলাপি রঙের একটি মহিষ ব্যাপক আগ্রহের কে...

বুড়িগঙ্গার বুকে রইস উদ্দিনের অন্তহীন সংগ্রাম
০৩ মে ২০২৬

বুড়িগঙ্গার বুকে রইস উদ্দিনের অন্তহীন সংগ্রাম

ভোর এখনো পুরোপুরি জাগেনি। আকাশের কিনারায় ফোটেনি আলো, তবুও বুড়িগঙ্গার কালচে পানিতে নেমে গেছে একটি বৈঠ...

বাংলায় সিঙাড়ার আবির্ভাব ও জনপ্রিয়তার ইতিহাস
১৭ এপ্রিল ২০২৬

বাংলায় সিঙাড়ার আবির্ভাব ও জনপ্রিয়তার ইতিহাস

সকালের নাশতা, বিকেলের আড্ডা কিংবা চায়ের আসরে গরম গরম সিঙাড়া বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাবার। মচমচে ময়দার...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই