ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
কয়েক মাস ধরে ক্লান্তি, সিঁড়ি উঠলে হাঁপ ধরা, মাথা ঘোরা। রক্ত পরীক্ষায় হিমোগ্লোবিন কম। পরিচিত কেউ পরামর্শ দিলেন, ‘আয়রনের ট্যাবলেট খান।’ কিছুদিন পর হিমোগ্লোবিনও বাড়ল। সবাই ভাবলেন, সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু আয়রন গেল কোথায়- এ প্রশ্নটি আর করা হলো না।
আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা বা আয়রন-ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাবারে আয়রনের অভাবের ফল। আবার এটি অতিরিক্ত মাসিক, পাকস্থলীর আলসার, অন্ত্রের প্রদাহ, কৃমি, সিলিয়াক ডিজিজ কিংবা পরিপাকতন্ত্রের অদৃশ্য রক্তক্ষরণের প্রথম সংকেতও হতে পারে। তাই শুধু আয়রন দিয়ে হিমোগ্লোবিন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; ঘাটতির উৎস খুঁজে পাওয়াই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা।
রক্তস্বল্পতা ও আয়রনের ঘাটতি এক নয়: লোহিত রক্তকণিকার হিমোগ্লোবিন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। হিমোগ্লোবিন প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে তাকে রক্তস্বল্পতা বলা হয়। আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে সব রক্তস্বল্পতা আয়রনের অভাবে হয় না। ভিটামিন বি–১২ বা ফলেটের ঘাটতি, কিডনির রোগ, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, থ্যালাসেমিয়া, ম্যালেরিয়া, রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়া এবং অস্থিমজ্জার রোগেও হিমোগ্লোবিন কমতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর তথ্য মতে, রক্তস্বল্পতা বিশ্বজুড়ে ৬-৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু, ৩৭ শতাংশ গর্ভবতী নারী এবং ১৫-৪৯ বছর বয়সী ৩০ শতাংশ নারীকে প্রভাবিত করে। সংস্থাটি রক্তস্বল্পতাকে নিজস্ব একটি রোগের পাশাপাশি অন্য সমস্যার সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবেও দেখতে বলেছে।
লক্ষণগুলো সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়: আয়রন ধীরে ধীরে কমলে শরীর কিছুদিন মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাই অনেকে সমস্যাটিকে কাজের চাপ, বয়স বা ঘুমের অভাব বলে ধরে নেন। সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা; হাঁটলে বা সিঁড়ি উঠলে শ্বাসকষ্ট; মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা বা বুক ধড়ফড়; ত্বক, ঠোঁট বা চোখের নিচের অংশ ফ্যাকাশে হওয়া; কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া; ঠান্ডা বেশি লাগা; নখ ভঙ্গুর বা চামচের মতো হয়ে যাওয়া; বরফ, মাটি বা অন্য অখাদ্য বস্তু খেতে ইচ্ছা করা; রাতে পা অস্থির লাগা; গুরুতর অবস্থায় বুকে ব্যথা। বিশ্রামেও শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ঘওঐ-এর তথ্য অনুযায়ী চিকিৎসাহীন আয়রন-স্বল্পতা হৃদযন্ত্র, গর্ভাবস্থা এবং শিশুর বিকাশেও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
আয়রন কমে কেন: শরীরে আয়রনের ঘাটতির তিনটি প্রধান পথ—পর্যাপ্ত আয়রন না পাওয়া, শরীরে শোষিত না হওয়া অথবা রক্তের সঙ্গে আয়রন বেরিয়ে যাওয়া। বাড়ন্ত শিশু-কিশোর, গর্ভবতী নারী এবং অতিরিক্ত মাসিক হওয়া নারীর চাহিদা বেশি। নিরামিষ বা অত্যন্ত সীমিত খাদ্যাভ্যাসেও ঘাটতি হতে পারে। তবে শুধু খাদ্যকে দায়ী করলে গুরুত্বপূর্ণ রোগ ধরা না ও পড়তে পারে।
পাকস্থলী বা অন্ত্রের আলসার, পলিপ, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, অর্শ, কৃমি এবং কখনো ক্যানসার থেকে অল্প অল্প রক্তক্ষরণ হতে পারে। মলে দৃশ্যমান রক্ত না থাকলেও মাসের পর মাস এই ক্ষরণ চলতে পারে। নিয়মিত কিছু ব্যথানাশক ব্যবহারেও পাকস্থলী বা অন্ত্রে ক্ষত ও রক্তক্ষরণ হতে পারে। অন্যদিকে সিলিয়াক ডিজিজ, পাকস্থলী বা অন্ত্রের অস্ত্রোপচার এবং কিছু পরিপাকতন্ত্রের রোগ আয়রন শোষণে বাধা দেয়।
কোন পরীক্ষা প্রয়োজন: শুধু হিমোগ্লোবিন দেখে আয়রনের ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। সাধারণত পূর্ণ রক্তচিত্র বা সিবিসিতে হিমোগ্লোবিনের পাশাপাশি লোহিত কণিকার আকারসহ অন্যান্য তথ্য দেখা হয়। শরীরে সঞ্চিত আয়রন সম্পর্কে জানতে ফেরিটিন বিশেষভাবে কার্যকর। প্রয়োজন হলে সিরাম আয়রন, ট্রান্সফেরিন স্যাচুরেশন, রেটিকুলোসাইট, বি–১২ ও ফলেট পরীক্ষা করা হয়। তবে সংক্রমণ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহে ফেরিটিন স্বাভাবিক বা বেশি দেখালেও আয়রনের ঘাটতি থাকতে পারে। তাই পরীক্ষার সংখ্যা নয়—রোগীর বয়স, উপসর্গ, প্রদাহ, কিডনি বা হৃদ্রোগ এবং অন্যান্য ফলাফল মিলিয়ে ব্যাখ্যা করাই গুরুত্বপূর্ণ। ঘওঐ-এর পুষ্টিবিষয়ক দপ্তর ফেরিটিনকে আয়রনের ভান্ডার নির্ণয়ের কার্যকর পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কখন পাকস্থলী ও অন্ত্র পরীক্ষা দরকার: ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে এমন নারী কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের নতুন আয়রন-স্বল্পতাজনিত রক্তস্বল্পতাকে শুধু খাবারের সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সুস্পষ্ট অন্য কারণ না থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস্ট্রোস্কপি ও কোলনোস্কপির মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করতে পারেন। ব্রিটিশ সোসাইটি অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির ২০২৬ সালে পর্যালোচিত নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আয়রন-স্বল্পতাসহ উপস্থিত পুরুষ ও ঋতুস্রাব-পরবর্তী নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কোনো না কোনো অন্তর্নিহিত রোগ পাওয়া যায়- যার বেশির ভাগই পরিপাকতন্ত্রে। মাসিক হয়- এমন নারীর ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক ওজন কমা, পেটব্যথা, মলের অভ্যাস পরিবর্তন, পারিবারিক অন্ত্রের ক্যানসারের ইতিহাস অথবা চিকিৎসার পরও রক্তস্বল্পতা না সারলে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।
চিকিৎসা- ট্যাবলেটের সঙ্গে কারণের সমাধান: আয়রনের ঘাটতি নিশ্চিত হলে অধিকাংশ রোগীর চিকিৎসা মুখে খাওয়ার আয়রন দিয়ে শুরু করা যায়। বমিভাব, পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মল কালো হওয়া পরিচিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সমস্যা হলে নিজে থেকে বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে ডোজ, ওষুধের ধরন বা এক দিন পরপর ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করা উচিত। সহ্য না হলে শোষণে সমস্যা থাকলে, ঘাটতি গুরুতর হলে বা দ্রুত আয়রন পূরণ প্রয়োজন হলে শিরায় আয়রন দেওয়া যেতে পারে। রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন কেবল নির্বাচিত গুরুতর পরিস্থিতিতে। হিমোগ্লোবিন স্বাভাবিক হলেই ওষুধ বন্ধ করার সময় হয়েছে- এমন নয়। শরীরের আয়রনের ভান্ডার পূরণ হয়েছে কি না, তা চিকিৎসক ফলোআপ পরীক্ষায় দেখবেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মাসিক, আলসার, কৃমি বা অন্য যে কারণে ঘাটতি হয়েছে; সেটির চিকিৎসাও করতে হবে।
খাবারে কী করবেন: মাছ, মাংস, কলিজা, ডিম, ডাল, ছোলা, শিম, গাঢ় সবুজ শাক এবং আয়রন-সমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। উদ্ভিজ্জ খাবারের আয়রন তুলনামূলক কম শোষিত হয়; একই খাবারে পেয়ারা, লেবু, টমেটো বা অন্য ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ খাবার থাকলে শোষণ বাড়ে। চা-কফি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার বা আয়রনের ওষুধের খুব কাছাকাছি সময়ে না খাওয়াই ভালো। তবে খাবার উপকারী হলেও মাঝারি বা গুরুতর ঘাটতিতে শুধু খাদ্য পরিবর্তন যথেষ্ট নাও হতে পারে।
শেষ কথা: রক্তস্বল্পতা শরীরের একটি ফলাফল; রোগের নাম বলে থেমে যাওয়ার জায়গা নয়। আয়রনের ট্যাবলেট রক্তের সংখ্যা ঠিক করতে পারে, কিন্তু গোপন রক্তক্ষরণের কারণটি আড়ালেও রেখে দিতে পারে। তাই মনে রাখুন, হিমোগ্লোবিন কত কম- এই প্রশ্নের পাশাপাশি আয়রন কেন কমল, এ প্রশ্নটিই কখনো জীবন রক্ষা করতে পারে।
লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা এবং শিক্ষক, গবেষক, কলামমিস্ট ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬