ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও হৃদরোগ-এই তিনটি অসংক্রামক রোগের পেছনে একটি পরিচিত কারণ হলো অতিরিক্ত ওজন। এ কারণে অনেকেই মনে করেন, ওজন কমাতে পারলেই বিপাকীয় স্বাস্থ্য সমস্যার বেশিরভাগ সমাধান হয়ে যাবে। তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, দৃশ্যমান সমস্যার আড়ালে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ নীরবে কাজ করে যাচ্ছে-দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ।
বিপাকীয় প্রদাহ সাধারণত মৃদু, দীর্ঘস্থায়ী এবং নীরব প্রকৃতির। এটি সহজে অনুভব করা যায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শর্করা প্রক্রিয়াজাতকরণ, চর্বি জমা হওয়া এবং রক্তনালির স্বাভাবিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রদাহই ধীরে ধীরে ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
লিভার, রক্তে শর্করা ও হৃদপিণ্ডের অদৃশ্য যোগসূত্র
ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার এবং হৃদরোগ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। কারণ এসব রোগের বিপাকীয় পথ অনেকাংশেই অভিন্ন। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যকৃত।
যখন শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় নিয়মিত অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা, চিনি এবং ক্যালোরি গ্রহণ করা হয়, তখন যকৃত সেই অতিরিক্ত শক্তিকে চর্বিতে রূপান্তর করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে যকৃতের কোষে চর্বি জমতে থাকে এবং একসময় তা ফ্যাটি লিভার রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে ফ্যাটি লিভারের ক্ষতি শুধু চর্বি জমায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন কিছু রাসায়নিক সংকেত নিঃসরণ করে, যা সারা শরীরে প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে। এসব প্রদাহজনক সংকেত ইনসুলিনের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা শরীরের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স যত বাড়তে থাকে, অগ্ন্যাশয়কে তত বেশি কাজ করতে হয় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে এই প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে ধমনিতে ক্ষতি ও প্লাক জমার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
খাদ্যাভ্যাসই নির্ধারণ করে প্রদাহের মাত্রা
আমরা প্রতিদিন যা খাই এবং যেভাবে জীবনযাপন করি, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে শরীরের প্রদাহের ওপর। সঠিক খাদ্যাভ্যাস শরীরকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করে, আর অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস প্রদাহকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত ময়দার তৈরি খাদ্য এবং ঘন ঘন চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রা বারবার বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি লিভারে চর্বি জমা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে শাক-সবজি, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিসমৃদ্ধ খাবার শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। এসব খাবারে থাকা ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং উপকারী চর্বি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। আর প্রদাহ কমানোর ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান শুধু ক্যালোরি গণনার চেয়ে খাবারের গুণগত মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওজন দিয়ে বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। কারণ এসব রোগ শুধু অতিরিক্ত ওজনের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রদাহ কমাতে যা করবেন
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনের কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য সুফল দিতে পারে।
প্রোটিন গ্রহণ বাড়ান
মসুর ডাল, শিম, সয়াজাত পণ্য, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, বাদাম ও বীজের মতো ভালো মানের প্রোটিন খাদ্যতালিকায় যুক্ত করুন। এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে এবং পেশির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
পরিশোধিত শর্করা কমান
সাদা ময়দার তৈরি খাবার, চিনিযুক্ত মিষ্টি এবং মিষ্টি পানীয় কম খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বারবার বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমে।
প্রতিটি খাবারে ফাইবার রাখুন
শাক-সবজি, ফল, গোটা শস্য এবং ডাল অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করে। পাশাপাশি এগুলো ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়তা করে।
স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ করুন
বাদাম, বীজ, অলিভ অয়েল এবং তৈলাক্ত মাছে এমন চর্বি থাকে, যা হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
নিয়মিত শরীরচর্চা বা নড়াচড়া ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং যকৃতের স্বাস্থ্য উন্নত করে। এমনকি প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটার অভ্যাসও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন
অপর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরে প্রদাহ সৃষ্টিকারী হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে বিপাকীয় ভারসাম্য আরো বিঘ্নিত হয়। তাই পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার ও হৃদরোগকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। কারণ আধুনিক গবেষণা বলছে, এই তিন রোগের পেছনে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সুস্থতার সমন্বিত চর্চাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সানা/আপ্র/১০/৬/২০২৬