তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। এর সঙ্গে বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতা যুক্ত হওয়ায় দিনের বেশিরভাগ সময়ই অসহনীয় গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। এই পরিস্থিতিতে বাড়ছে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি ও হিটস্ট্রোকের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। একই সঙ্গে অনিরাপদ পানি পানের কারণে বাড়ছে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব। সুস্থ থাকার জন্য কী করবেন- এ নিয়েই এবারের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যার প্রধান ফিচার
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে হিটস্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এই তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, শ্রমজীবী মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং তাপদাহজনিত জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকরা দিয়েছেন একগুচ্ছ জরুরি পরামর্শ ও সতর্কতা।
তাপপ্রবাহকে কেন গুরুত্ব দিতে হবে
আইসিডিডিআর,বি’র তথ্য অনুযায়ী, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা যখন ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয় এবং সেই অবস্থা টানা দুই দিনের বেশি স্থায়ী থাকে, তখন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
তীব্র এই গরমে প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে ভোগান্তির শিকার হলেও কয়েকটি শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
শ্রমজীবী মানুষ
যারা জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। বিশেষ করে রিকশা ও ভ্যানচালক, কৃষক এবং নির্মাণশ্রমিকদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী
গর্ভবতী নারী, নবজাতক, বয়োবৃদ্ধ এবং শারীরিক ও মানসিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বাড়তি সুরক্ষা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
যারা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস কিংবা ফুসফুসের জটিল রোগে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে তাপদাহ অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গৃহকর্মী ও বদ্ধ পরিবেশে কর্মরত ব্যক্তি
যারা রান্নাঘরে চুলার পাশে অথবা উত্তপ্ত ও বদ্ধ পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, তারাও ঝুঁকির বাইরে নন।
কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
চিকিৎসকদের মতে, গরমে কাজ করার সময় বা চলাফেরার মধ্যে শরীরে কিছু বিশেষ উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা করা যাবে না। এগুলো হিটস্ট্রোক বা তীব্র তাপজনিত অসুস্থতার পূর্বাভাস হতে পারে।
* শরীরের চামড়া অতিরিক্ত গরম ও লালচে হয়ে যাওয়া
* তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
* প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া অথবা প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া
* চরম গরমের মধ্যেও হঠাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া
* চোখে ঝাপসা বা অন্ধকার দেখা
* হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে যাওয়া
* মানসিক বিভ্রান্তি, অসংলগ্ন আচরণ অথবা অজ্ঞান হয়ে পড়া
আইসিডিডিআর,বি’র জরুরি নির্দেশনা
তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে আইসিডিডিআর,বি কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে।
যা অবশ্যই করবেন
* তীব্র রোদ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে ছাতা ব্যবহার করুন বা মাথা ঢেকে রাখুন।
* রোদে বা কায়িক পরিশ্রমের সময় বিরতি নিয়ে ছায়াযুক্ত কিংবা শীতল স্থানে বিশ্রাম নিন।
* ঢিলেঢালা, হালকা রঙের সুতি ও আরামদায়ক পোশাক পরুন।
* তৃষ্ণা না লাগলেও পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান করুন।
* নিয়মিত গোসল করুন এবং চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিন।
* সহজপাচ্য, পুষ্টিকর, টাটকা ও হালকা খাবার গ্রহণ করুন।
যা থেকে বিরত থাকবেন
* বাসি, পচা ও অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাবেন না।
* সরাসরি রোদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করবেন না।
* রাস্তার খোলা বা অনিরাপদ পানি, শরবত এবং কৃত্রিম রংযুক্ত ঠান্ডা পানীয় পরিহার করুন।
পরিবারের জন্য বাড়তি সতর্কতা
আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে, পরিবারে যদি শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি থাকেন, তাহলে তাদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। ঘরের ভেতরে যেন অতিরিক্ত গরম না হয়, সেজন্য জানালা খুলে বা ফ্যান চালিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কেউ অসুস্থ বোধ করলে কোনো ধরনের কবিরাজি বা ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
‘পানিশূন্যতায় বিকল হতে পারে কিডনি’
দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে এবং বাতাসে অস্বাভাবিক আর্দ্রতার কারণে সারাদেশে জনজীবন বিপর্যস্ত। এসময় প্রচুর ঘামের ফলে পানির সঙ্গে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় লবণও বেরিয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ কমে যাওয়া, দুর্বলতা, মাথা ঝিমঝিম করা এবং মারাত্মক পানিস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এই পানিস্বল্পতা অবহেলা করলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো জটিলতর সমস্যা হওয়াও বিচিত্র নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘মাত্রাতিরিক্ত গরমের কারণে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে হলে হিটস্ট্রোকের মতো মারাত্মক আশঙ্কা থাকে। এই অবস্থায় রোগীর শরীরে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রা, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, শুষ্ক ও লালচে ত্বক, অসংলগ্ন আচরণ এবং খিঁচুনির মতো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’
শিশু-বয়স্কদের জন্য দ্বিগুণ শঙ্কা
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, এই তাপদাহে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী, প্রতিবন্ধী এবং যারা মাঠে-ময়দানে কায়িক পরিশ্রম করেন-যেমন কৃষক, শ্রমিক ও রিকশাচালক-তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তার মতে, সরাসরি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, জ্বালাপোড়া করা কিংবা ফোসকা পড়ার মতো ‘সান বার্ন’ হতে পারে। পাশাপাশি ঘাম ও ময়লা জমে ত্বকে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, গরমে তৃষ্ণা মেটাতে রাস্তাঘাটের অবিশুদ্ধ পানি বা শরবত পান করলে ডায়রিয়া, বমি, টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
সুস্থ থাকার উপায় ও জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা
তীব্র গরমের সময়ে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি এবং হালকা, ঢিলেঢালা সুতি পোশাক ব্যবহার করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি লবণের ঘাটতি পূরণে ওর স্যালাইন, ডাবের পানি ও টাটকা ফলের শরবত খাওয়া জরুরি।’
কেউ অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাকে দ্রুত ছায়াযুক্ত ও শীতল স্থানে নিয়ে যেতে হবে। ফ্যান বা বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ভেজা কাপড়ে শরীর মুছে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে হবে। অবস্থা গুরুতর হলে কোনো ধরনের বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
প্রকৃতির এই কঠিন সময়ে সচেতনতা ও সতর্কতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। কারণ তাপদাহ শুধু অস্বস্তি নয়, অবহেলা করলে তা প্রাণঘাতী সংকটেও রূপ নিতে পারে।
সানা/আপ্র/১০/৬/২০২৬