করলার স্বাদ সাধারণত বিশ্বের গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে পাওয়া যায় এবং এর তীব্র তেতো স্বাদ রয়েছে। তবে এর অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। এটি এমন একটি সবজি- যা মূলত এশিয়া ও আফ্রিকায় খাওয়া হয়। তবে এটি বহু শতাব্দী ধরে আয়ুর্বেদ ও ঐতিহ্যবাহী চীনা ওষুধসহ (ঞঈগ) ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অবশ্যই অনেকের কাছে করলার স্বাদ অপ্রীতিকর বলে মনে হয়। তবে যারা এর স্বাদ সহ্য করতে পারেন তাদের জন্য এটি একটি স্বাস্থ্যকর খাবার হতে পারে।
করলার প্রকারভেদ: সারা বিশ্বে অনেক ধরনের করলা জন্মে। সাধারণত করলা রজাতগুলো হলো-
ভারতীয় করলার (মোমর্ডিকা চারান্তিয়া): পাতলা, সূক্ষ্ম প্রান্ত ও খাঁজকাটা শিরাসহ। গাঢ় সবুজ ও আপাতদৃষ্টিতে আরও তেতো।
চায়নিজ করলা: লম্বা ও চওড়া, হালকা সবুজ খোসার নিচে মসৃণ ঢাল থাকে। ভারতীয় করলার মতো শক্তিশালী নয়।
সাদা করলা: এটি একটি বিরল ধরনের করলা- যার খোসা সাদা, একটু কম তেতো এবং আরো কোমল।
বুনো করলা: ছোট, অত্যন্ত তেতো এবং ভেষজ চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
অনেকেরই প্রিয় তরকারির তালিকার রয়েছে উচ্ছে বা করলা। বিশেষ করে গরমের দিনে দুপুরের খাবার পাতে করলা ভাজি, করলার ঝোল খেলে শরীর ঠান্ডা থাকে। পুষ্টিগুণে ভরপুর সবজিটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে এ উপকারি সবজিটিই ক্ষতির কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত করলা খেলে যে ক্ষতি হয়, তা হলো-
রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া: করলা বা উচ্ছের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু নিয়মিত সুগারের ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত করলা বা করলার রস খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’ বলা হয়। ফলে হঠাৎ করে মাথা ঘোরা, শরীর কাঁপানো, বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং এমনকি রোগী অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যেতে পারেন।
লিভার বা যকৃতের মারাত্মক ক্ষতি: করলায় আছে ‘মোমোরচারিন’ নামক এক ধরণের প্রোটিন। এই সবজি অতিরিক্ত খেলে এই উপাদানটি লিভারের এনজাইমগুলোর ক্ষরণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ফলে লিভারের কোষে প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস নষ্ট করে দেয় লিভারের কার্যক্ষমতা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে লিভার টক্সিসিটি বা যকৃতের ক্ষতি বলা হয়।
ডায়রিয়া ও পেটের তীব্র সমস্যা: করলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ও ল্যাক্সেটিভ। অতিরিক্ত করলা পাকস্থলীর ক্ষতি করে। ফলে দেখা দেয় তীব্র পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা, বদহজম, গ্যাসের সমস্যা; এমনকি পাতলা পায়খানা ও ডায়রিয়া হতে পারে।
গর্ভবতীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি: গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত উচ্ছে খাওয়া বিপদের কারণ হতে পারে। ফলে গর্ভাবস্থায় রক্তপাত শুরু হতে পারে। এমনকি গর্ভপাতের মতো মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় ডায়েটে উচ্ছে রাখার আগে অবশ্যই গাইনিকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পুরুষ ও নারীদের প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব: প্রাণীদের ওপর করা কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিমাণে করলার বীজ বা রস নিয়মিত খেলে তা প্রজনন হরমোনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি পুরুষদের শুক্রাণুর উৎপাদন এবং নারীদের ডিম্বাণু তৈরির প্রক্রিয়াকে সাময়িকভাবে ব্যাহত করতে পারে। যদিও মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন, তবুও চিকিৎসকরা সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন।
প্রতিদিন কতটুকু করলা খাওয়া নিরাপদ: পুষ্টিবিদদের মতে, সুস্থ থাকার জন্য সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন করলার তরকারি বা ভাজা খাওয়া একদম সাধারণ এবং নিরাপদ। তবে আপনি যদি প্রতিদিন উচ্ছের রস খেতে চান, তাহলে সেটি যেন কোনোভাবেই ৩০ থেকে ৫০ মিলিলিটারের বেশি না হয়।
করলা কেবল খুব তেতো সবজি নয়; এমন একটি সবজি- যা একটি প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে বিবেচিত হয় যার পুষ্টিগুণ এবং কিছু ঔষধি গুণ রয়েছে। তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে, ওজন কমাতে এবং সুস্থ হজমে সহায়তা করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। তবে আপনি যে কোনো খাবার খান বা পরিপূরক হিসাবে গ্রহণ করেন তার মতো, পরিমিত পরিমাণে খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার কোনও চিকিৎসাগত সমস্যা বা উদ্বেগ থাকে, যেমন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, তাহলে আপনার প্রাকৃতিক অস্ত্রাগারে এটি যোগ করার আগে দয়া করে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
সূত্র: অনলাইন
আপ্র/কেএমএএ/০২.০৭.২০২৬