দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ দেখানোর জন্য চলতি বছরের পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া কণা পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালসেন। আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগার গড়ে তোলা এবং এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যও তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে এক সংবাদ সম্মেলনে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এ পুরস্কারের জন্য হালসেনের নাম ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হালসেন পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে এক কোটি বিশ লাখ সুইডিশ ক্রাউন পাবেন, যা ১২ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি।
নোবেল কমিটি বলেছে, মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ দেখানোর পাশাপাশি আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগারে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
নিউট্রিনো অত্যন্ত রহস্যময় এক ধরনের কণা। এগুলো সর্বত্র রয়েছে এবং প্রতি মুহূর্তে পৃথিবী ও মানবদেহ ভেদ করে চলে যায়। কিন্তু এসব কণার বৈদ্যুতিক আধান না থাকায় সাধারণভাবে তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ালে সেই ঘটনাকে শনাক্ত করা সম্ভব।
মহাবিশ্বের কিছু উৎস থেকে এমন নিউট্রিনো ছড়িয়ে পড়ে, যাদের শক্তি পৃথিবীর গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব সর্বোচ্চ শক্তির তুলনায় ১০ লাখ গুণ পর্যন্ত বেশি। কিন্তু এসব উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর উৎস কোথায়, সেগুলো আসলে কী এবং এসব উৎসের ভেতরে কী ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে - তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
এখানেই হালসেনের বৈজ্ঞানিক ধারণার গুরুত্ব। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রথম দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্তের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। তার ধারণা ছিল, কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে যে আলোকঝলক তৈরি হয়, তা দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ হিমবাহের বরফে বসানো আলোকসংবেদী সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।
হালসেনের মূল ধারণাটি ছিল, দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল বরফকে বিশাল এক নিউট্রিনো শনাক্তকারী হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তার পরিকল্পনা দ্রুত অন্য গবেষকদের সমর্থন পায় এবং কয়েক বছরের মধ্যে বরফের গভীরে সেন্সর বসিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়।
উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো অত্যন্ত বিরল। তাই পর্যাপ্তসংখ্যক নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়া শনাক্ত করতে বিপুল পরিমাণ বরফ প্রয়োজন। এই প্রয়োজন থেকেই এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগার গড়ে তোলা হয়। এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১১ সালে।
হালসেনের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই বিশাল স্থাপনায় বরফের গভীরে অসংখ্য আলোকসংবেদী সেন্সর বসানো হয়েছে। নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলে সৃষ্ট আলোর ঝলক এসব সেন্সর শনাক্ত করে। এর মাধ্যমে গবেষকরা মহাবিশ্বের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে পৃথিবীতে পৌঁছানো উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
অন্য অনেক কণার তুলনায় নিউট্রিনোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোনো পরিবেশ থেকে যাত্রা করার সময় এগুলো সাধারণত দিক পরিবর্তন করে না এবং উল্লেখযোগ্য শক্তিও হারায় না। ফলে উচ্চশক্তির নিউট্রিনো যে মহাজাগতিক পরিবেশ থেকে এসেছে, সেই উৎস সম্পর্কে সরাসরি তথ্য বহন করতে পারে। এ কারণে নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের এমন কিছু রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব, যা অন্য কোনো উপায়ে জানা কঠিন।
নোবেল কমিটির পদার্থবিদ্যা পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স বলেন, ‘ফ্রান্সিস হালসেন গবেষক ও প্রকৌশলীদের একটি আন্তর্জাতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা আমাদের একটি অসাধারণ যন্ত্র দিয়েছেন। তার অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ তৈরি করেছে।’
আইসকিউবের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রহ করা নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়ার তথ্য থেকে উচ্চশক্তির নিউট্রিনো উৎপাদনকারী প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাজাগতিক পরিবেশ সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়ার আশা করছেন গবেষকরা। এমনকি এসব তথ্যের মাধ্যমে আগে অজানা কোনো মহাজাগতিক ঘটনারও সন্ধান মিলতে পারে।
গত বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞানী জন ক্লার্ক, মিশেল দেভোরে ও জন মার্টিনিস। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার নীতিগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে দেখানোর জন্য তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়। তাদের গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কম্পিউটিং ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
আলবার্ট আইনস্টাইন, মেরি কুরি, পিয়ের কুরি, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও নিলোস বোরের মতো বিজ্ঞানীরাও এর আগে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছেন। তাদের গবেষণা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণার ভিত্তি বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চলতি বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয় সোমবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। বুধবার রসায়নে, বৃহস্পতিবার সাহিত্যে এবং শুক্রবার শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। আগামী ১৩ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ। দিনটি আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী। পুরস্কার বিতরণের পর স্টকহোম সিটি হলে নৈশভোজের আয়োজন করা হবে।
সানা/ডিসি/আপ্র/৬/১০/২০২৬