গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়তে পারে খাদ্যমূল্য

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৫১ পিএম, ২০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০৩:১১ এএম ২০২৬
যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়তে পারে খাদ্যমূল্য
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, সার সরবরাহে সংকট এবং এল নিনোর প্রভাবে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী কয়েক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার এক পার্কিং কর্মী মুহাম্মদ ইয়াসিন এরই মধ্যে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি জানান, তার এলাকায় খাবারের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। আগে যে খাবার ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার রুপিয়ায় কিনতে পারতেন, এখন তার জন্য খরচ করতে হচ্ছে ১৫ হাজার রুপিয়া। অথচ তার সাপ্তাহিক আয় মাত্র ২ লাখ থেকে ৩ লাখ রুপিয়া। চার সন্তানের জনক ইয়াসিনের মতো সীমিত আয়ের মানুষের ওপর খাদ্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি ক্রমেই বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

ইন্দোনেশিয়ায় দেরিতে বৃষ্টি আসার পূর্বাভাসের মধ্যে চালের দাম ইতোমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মিশরে পাউরুটির দাম বেড়েছে এক-চতুর্থাংশ। অন্যদিকে, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল মৌসুমি বায়ুর কারণে ভারতে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় চিনির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরো বলেন, এসব পরিস্থিতি সম্মিলিতভাবে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং এমনকি পুরো আগামী বছরজুড়েই এর বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। এসব দেশের মানুষ আয়ের বড় অংশ খাবার কিনতে ব্যয় করেন। ফলে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন দরিদ্র পরিবারগুলো।

বিশ্বব্যাংকের ১৫০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে, ২২ শতাংশ দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ১৪ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক গড়ে বেড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুদ্ধ ও পরিবহন ব্যয়ে বাড়ছে সরবরাহ সংকট
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য রপ্তানির অবকাঠামোয় হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে গমের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মিশর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প বাজার খুঁজতে হচ্ছে। লোহিত সাগরে নিরাপত্তাহীনতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে চলাচল করতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিও ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

চলতি বছর বিশ্ববাজারে গমের দাম আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোয় চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। পরে কিছুটা কমলেও এখনো তা বেশি রয়েছে।

নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেন, পণ্যের বাড়তি দামের কারণে ব্যবসায় চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি এখন কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিশরে ভর্তুকি ছাড়া বড় আকৃতির একেকটি রুটির দাম জুলাইয়ের ৪ মিশরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে এখন প্রায় ৫ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভারতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

মিশরের রাজধানী কায়রোর কেন্দ্রস্থলে একটি বেকারি পরিচালনা করেন সাঈদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ। তিনি জানান, শুধু ময়দার দামই বাড়েনি, দক্ষ শ্রমিক নিয়োগেও এখন বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, পানি, ইস্ট এবং রুটি তৈরির অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও যুদ্ধের কারণে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নৌপথে পরিবহনভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার আশঙ্কা
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছিল। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়তে শুরু করায় মূল্যস্ফীতি আরো দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক দেশ স্থানীয়ভাবে ভালো ফসল উৎপাদন করতে পারায় এত দিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্যপণ্য কেনা কমিয়ে রেখেছিল। এখন এসব দেশকে আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেক্সান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকেরা বাজারে ফিরলে চাহিদা নতুন করে বাড়তে পারে।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরো বলেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত এত দিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। তবে সেই সুরক্ষা ক্রমেই কমছে।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। কিন্তু এখন চুক্তি নবায়নের সময় তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।

ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য কোম্পানি পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং বলেন, পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। দেশটির মুদ্রা রুপিয়ার মান কমে যাওয়ায় স্থানীয় মুদ্রায় হিসাব করলে এই ব্যয়ের প্রভাব আরো বেশি দেখা যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বেশি দাম দিয়েও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়ছে। জাকার্তার একটি আটা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের চালান কমে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটি গমকল তাদের উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় কম গম পাচ্ছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় সেপ্টেম্বরে গম আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯১ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।

তবে আপাতত সয়াবিন ও ভুট্টার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ভবিষ্যতে এই দুই শস্যের সরবরাহ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদনের ওপর। সূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/২০/১০/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

চীনে পুতিন, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সম্ভাবনা
২০ অক্টোবর ২০২৬

চীনে পুতিন, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের সম্ভাবনা

আগামী মাসে চীনে অনুষ্ঠেয় এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লা...

ফ্রান্সের মতো বিক্ষোভে উত্তাল ইতালিও, ১৪১ পুলিশ সদস্য আহত-গ্রেফতার ১৯৭
১৯ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের মতো বিক্ষোভে উত্তাল ইতালিও, ১৪১ পুলিশ সদস্য আহত-গ্রেফতার ১৯৭

প্রতিবেশী দেশ ফ্রান্সের মতো বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইতালি। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে...

ফ্রান্সে অস্থিরতা প্রশমনে কয়েকটি নগরীতে আংশিক কারফিউ জারির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
১৯ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সে অস্থিরতা প্রশমনে কয়েকটি নগরীতে আংশিক কারফিউ জারির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ফ্রান্সে জনসাধারণ এবং দোকানপাটের সুরক্ষায় কিছু নগরীকে আংশিক কারফিউ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে জানি...

নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান
১৯ অক্টোবর ২০২৬

নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে-এমন আশঙ্কায় সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে ইরান। নতুন অ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বের কোথাও নেই: রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বিশ্বের অন্য কোথাও নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, বিশ্বজুড়ে যখন হানাহানি ও হিংসার আগুন জ্বলছে, তখন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারছেন। রোববার (১৮ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমী ২০২৬ উপলক্ষ্যে ঢাকার রমনা কালীমন্দির পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে