ঢাকার চারপাশের পাঁচ নদী ও দুই সিটি করপোরেশনের ৫৫টি খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পানিপ্রবাহ সচল, নদীর পাড় সংরক্ষণ এবং নৌযান চলাচলের উপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। একইসঙ্গে খালের দুই পাড়ে গাইডওয়াল ও রিটার্নিং ওয়াল নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ এবং হাঁটার পথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের মধ্যেই চলমান কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ত্রিমোহনী খাল ব্রিজে খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি প্রকল্পের আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জিরানি খাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঢাকাকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার চিন্তার অংশ হিসেবে ঢাকার চারপাশের পাঁচটি নদী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, নদীর পাড় সংরক্ষণ, গাইডওয়াল ও রিটার্নিং ওয়াল নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নদীগুলোকে ৪০-৫০ বছর আগের মতো সচল করে নৌযান চলাচলের উপযোগী করাই লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৬টি এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯টি খাল পরিষ্কার করে গাইডওয়াল, রিটার্নিং ওয়াল, হাঁটার পথ ও নেটিংয়ের মাধ্যমে সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং পানিপ্রবাহ সচল করা হবে। একইসঙ্গে ঢাকার পয়োনিষ্কাশন লাইনগুলো শহরের বাইরে নিয়ে দাসেরকান্দি, পাগলা, মিরপুর, উত্তরা ও রায়েরবাজার-মাদানীসহ নির্ধারিত স্থানে পয়োনিষ্কাশন শোধনাগারের মাধ্যমে পরিশোধন করে নদীতে পরিষ্কার পানি ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে গঠিত কমিটি গত তিন মাস ধরে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাত-আটটি বৈঠকে ঢাকাকে কীভাবে সুন্দর ও বাসযোগ্য করা যায়, সে বিষয়ে প্রতিবেদন ও চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিটি ঢাকার চারপাশের নদী স্টিমার বা ফেরিতে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় কাজও চিহ্নিত করেছে।
তিনি বলেন, অতীতের মতো শুধু মুখে ঢাকা বা দেশকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর বানানোর কথা না বলে একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এমন একটি ঢাকা গড়ে তুলতে চান, যেখানে জলাবদ্ধতা থাকবে না, খালগুলো সচল থাকবে, খালের পাশে হাঁটার জায়গা থাকবে, বৃক্ষরোপণ হবে এবং ঢাকার চারপাশের পাঁচ নদী প্রাণ ফিরে পাবে।
মীর শাহে আলম বলেন, নদীর দুই পাড় গাইডওয়াল ও রিটার্নিং ওয়াল দিয়ে সংরক্ষণ করে নৌযান চলাচল ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া ও অনুমোদনের কাজ চলছে। রোববার মান্ডা, জিরানি, কালুনগর ও শ্যামপুর- এই চারটি খালের কাজ পরিদর্শন করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমের মধ্যেই খালগুলোর কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে মানুষের ব্যবহার ও জলাবদ্ধতা নিরসনের উপযোগী করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হবে।
তিনি আরো জানান, জিরানি খালের বাঁশের সেতুটি অল্পদিনের মধ্যে আরসিসি সেতুতে রূপান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢাকায় কোনো বাঁশের সেতু থাকবে না। তবে অবৈধভাবে নির্মিত সেতু এবং খাল দখল করে গড়ে তোলা স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বছর সব ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকার একা এ কাজ করতে পারবে না, জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকেরা মানুষের ভোটের চিন্তা না করে ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং নগর পরিষ্কার রাখার কাজ করছেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বেহেশতের গ্যারান্টি দেব না, তবে উন্নয়নের গ্যারান্টি দেব।’ রাস্তাঘাট ঠিক করা, খাল সচল করা এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করে দুর্গন্ধমুক্ত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার কথা জানান তিনি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে যাচ্ছে। যেখানে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে, সেখানে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে। জনগণের দেওয়া দায়িত্বকে সম্মান করে আগামী পাঁচ বছর মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করে যেতে চান।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, ঢাকা মহানগরে প্রায় তিন কোটি মানুষের বাস। ফলে এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, নদী-খাল ও জলাশয়ের দুই পাড় গাইডওয়াল দিয়ে বাঁধাই করার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হবে। ময়লা-আবর্জনা যাতে নদীতে ফেলা না হয়, সে ব্যবস্থাও করা হবে। আবর্জনা সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় শোধন করা হবে। এ কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, গত ১৫ বছর ধরে খালগুলো অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। যারা দখল করেছে, তাদের পরিচয় শুধু অবৈধ দখলদার। তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। খালগুলো দখলমুক্ত করে এ এলাকার উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হবে। ঢাকা-৯-এর মানুষের কাছে এবং প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাঁশের সাঁকোগুলোও আরসিসি সেতুতে রূপান্তরের কাজ এগিয়ে চলছে।
এ সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম, স্থানীয় সরকার বিভাগ সচিব মো. শহীদুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/২৭/৯/২০২৬