পহেলা বৈশাখের উৎসব ঘিরে ঢাকার মাছের বাজারে রূপালি ইলিশের চাহিদা যখন তুঙ্গে, তখন সেই চাহিদার ভিড়ে ইলিশের নামেই ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে চন্দনা ও সার্ডিন মাছ-এমনই চিত্র উঠে এসেছে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে।
বিক্রেতা ও আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অবিকল ইলিশের মতো দেখতে সামুদ্রিক মাছ সার্ডিন এবং আংশিক ইলিশজাতীয় চন্দনা মাছ অনেক জায়গায় ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। কখনো আবার এসব মাছই সরাসরি ‘চন্দনা ইলিশ’ নামে বিক্রি হচ্ছে। এসব মাছ মূলত মিয়ানমার থেকে আমদানি হয়ে থাকে।
আকারে ছোট এবং রঙে তুলনামূলক কম উজ্জ্বল হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা আসল ইলিশ কিনছেন না। যদিও রান্নার পর স্বাদে পার্থক্য ধরা কঠিন হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন যাত্রাবাড়ীর এক আড়তদার ওবায়দুর রহমান। তিনি বলেন, রান্নায় মশলার কারণে স্বাদ আলাদা করা কঠিন। যারা নিয়মিত ইলিশ খায়, তারাই পার্থক্য ধরতে পারে।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি ও বাস্তবতা: বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মিশ্র মাছ বিক্রি না করলে লোকসান গুনতে হয়। তাদের ভাষায়, এভাবে বিক্রি না করলে পোষানো সম্ভব নয়।
যাত্রাবাড়ীর এক আড়তদার নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা তো চন্দনা ইলিশ নামেই বিক্রি করি। কেউ ইলিশ বলে বিক্রি করলে সেটা আমাদের দায়িত্ব না। অন্যদিকে বিক্রেতা ইলিয়াস হোসেন জানান, চন্দনা ইলিশ ইলিশের অর্ধেক দামে বিক্রি হয়। এটা গরিবের ইলিশ হিসেবে অনেকে কিনে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজালাল বলেন, সার্ডিন ও চৌক্কা ধরনের মাছ আকারে ছোট হলেও অনেক সময় এগুলো স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে সরকারি পর্যায়েও উল্লেখ রয়েছে। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে যেসব মাছ রপ্তানির অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত, সেগুলোই আমাদের দেশে আসছে। কোয়ালিটি কন্ট্রোল আরো জোরদার করা দরকার।
তার মতে, এসব মাছ বিক্রি হলে সেগুলো স্পষ্টভাবে ‘সার্ডিন’ বা ‘চন্দনা’ নামেই বিক্রি হওয়া উচিত, যাতে ক্রেতা বিভ্রান্ত না হন।
দাম ও বাজার পরিস্থিতি: বৈশাখ উপলক্ষে যাত্রাবাড়ীর আড়তে সার্ডিন মাছ বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা দরে। তুলনায় আধা কেজি থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৯০০ থেকে ১৫০০ টাকা কেজি দরে। আর রূপালি ইলিশের দাম আকারভেদে ১২০০ থেকে শুরু করে ৩৫০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে।
খুচরা বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। এক কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৯০০ টাকার কাছাকাছি, দুই কেজি ওজনের ইলিশের দাম ২৮০০ থেকে ৩৮০০ টাকা পর্যন্ত।
ক্রেতা ও বিক্রেতার ভিন্ন অভিজ্ঞতা: ক্রেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, ইলিশের নামে অন্য মাছ কিনতে হচ্ছে। আবার বিক্রেতাদের দাবি, উচ্চ দামের কারণে আসল ইলিশ কিনতে না পেরে অনেকে চন্দনা বা সার্ডিনই বেছে নিচ্ছেন। এক ক্রেতা আসিফ মাহমুদ বলেন, পাঁচটা মাছ কিনলাম প্রায় আট হাজার টাকায়। দাম অনেক বেশি। অন্যদিকে বিক্রেতা মিজানুর রহমান বলেন, মানুষ কম কিনছে, বরফ খরচও উঠে আসছে না। না বিক্রি হলে পরে আরো কম দামে বিক্রি করতে হবে।
বৈশাখের আগে ইলিশের বাজারে সরবরাহ থাকলেও ক্রেতা কম থাকায় বিক্রেতারা সময়ের আগেই অনেকটা উদ্বিগ্ন। শেষ রাতের দিকে আড়তে বেচাকেনা হলেও সকালে ভিড় কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উৎসবের আবহে ইলিশকে কেন্দ্র করে বাজারে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে ক্রেতা সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে। ইলিশের নামে চন্দনা ও সার্ডিন বিক্রি-এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না এলে বাজারে বিভ্রান্তি আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৩/৪/২০২৬