গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

মেনু

আজ পহেলা বৈশাখ; ঐতিহ্য, গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির মহামিলনে বাঙালির নতুন বছরের যাত্রা

নববর্ষে আলোর প্রত্যাশা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০২:১১ পিএম, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৪:২৬ এএম ২০২৬
নববর্ষে আলোর প্রত্যাশা
ছবি

চৈত্রের শেষ প্রহরের নিঃশব্দ বিদায় পেরিয়ে আজ নতুন সূর্যের আলোয় জেগে উঠেছে বাঙালির চিরায়ত প্রাণ -ফাইল ছবি

চৈত্রের শেষ প্রহরের নিঃশব্দ বিদায় পেরিয়ে আজ নতুন সূর্যের আলোয় জেগে উঠেছে বাঙালির চিরায়ত প্রাণ। পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩-বাংলা নববর্ষের এই শুভক্ষণে বিদায় নিয়েছে পুরনো বছরের ক্লান্তি, ব্যর্থতা ও গ্লানি; আর নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে জাতির হৃদয়ে জেগেছে আলোর প্রত্যাশা, সম্ভাবনার দীপ্ত আহ্বান।

“মুছে যাক গ্লানি”-এই চিরন্তন বাণী আজ কেবল কবিতার পঙ্ক্তি নয়; বরং বাঙালির আত্মার গভীর উচ্চারণ, নবজাগরণের অনিবার্য অঙ্গীকার।

চৈত্রের বিদায়, বৈশাখের আগমন: বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তির নীরব বিষণ্নতা গতকাল মিলিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। বছরের শেষ সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির জীবনে নেমে আসে একধরনের স্মৃতিকাতরতা-পুরনো হিসাব, পুরনো ব্যর্থতা, পুরনো ক্লান্তি।

আজ সেই অতীতকে পিছনে ফেলে নতুন সূর্যের প্রথম আলোয় শুরু হলো নতুন যাত্রা। পহেলা বৈশাখ তাই কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি সময়ের পুনর্জন্ম, আত্মার পুনর্গঠন, এবং জাতিগত চেতনার নবায়ন।

বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসব: পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে এক অনন্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়। এটি কেবল উৎসব নয়-এটি বাঙালির অস্তিত্বের ভাষা, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এবং আত্মপরিচয়ের গর্বিত প্রকাশ।

এই দিনে বাঙালি ফিরে তাকায় নিজের শিকড়ে-লোকজ সংস্কৃতি, কৃষিনির্ভর জীবনধারা, হালখাতা, মেলা, গান, কবিতা ও শোভাযাত্রার ভেতর দিয়ে। অতীতের ঐতিহ্য আর বর্তমানের বাস্তবতা মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক সর্বজনীন উৎসবের পরিসর।

নববর্ষের দার্শনিক বার্তা: নববর্ষ বাঙালিকে কেবল আনন্দ দেয় না, দেয় আত্মশুদ্ধির আহ্বান। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়-মানুষের জীবন কেবল অতীতের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। এই দিন আমাদের শেখায়-ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে, এবং বিভাজন ভুলে ঐক্যের পথে এগিয়ে যেতে। তাই পহেলা বৈশাখ একাধারে উৎসব, আত্মপর্যালোচনা ও নতুন অঙ্গীকারের দিন।

গণতন্ত্রের নতুন প্রেক্ষাপটে নববর্ষ: এবারের নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। দীর্ঘ সময়ের শাসন-পরিবর্তনের পর দেশে নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে জাতি নববর্ষকে বরণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ কেবল সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; বরং এটি গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা, নাগরিক অধিকার ও জাতীয় পুনর্গঠনের প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

উৎসবের সর্বজনীন বিস্তার: ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আজ উৎসবের ঢেউ। রঙ, আলো, গান আর শোভাযাত্রায় মুখর হয়ে উঠেছে নগর ও গ্রাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এবারের প্রতিপাদ্য-

নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান: শোভাযাত্রায় লোকজ প্রতীকী মোটিফ হিসেবে স্থান পেয়েছে মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া-যা বাঙালির জীবনের সংগ্রাম, সৃজন ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি বহন করে। রমনা বটমূলে ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ভোরের প্রথম আলোয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করেছে, যেখানে জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছে প্রভাত।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বর্ণিল নববর্ষ উদযাপন: বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের বাণী বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ক্রোড়পত্র আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা এবং লোকজ উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় সব অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে জাতীয় সংগীত ও বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী গান পরিবেশনের মাধ্যমে।

মেলা, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রাণবন্ত উপস্থিতি: বাংলা একাডেমি ও বিসিকের যৌথ উদ্যোগে সাত দিনব্যাপী নববর্ষ মেলা শুরু হয়েছে, যেখানে গ্রামীণ শিল্প, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন আয়োজন করেছে ১৪ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা, যা লোকসংস্কৃতির জীবন্ত প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। এই আয়োজনগুলো কেবল বিনোদন নয়-বরং বাঙালির আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিক প্রকাশ।

গ্রাম থেকে শহর: দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আজ বৈশাখী শোভাযাত্রা, মেলা, রচনা প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়েও শোভাযাত্রার আয়োজনের মাধ্যমে নববর্ষকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে মানুষের দোরগোড়ায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পালন করছে এই উৎসব, যেখানে অংশ নিচ্ছে শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম।

সামাজিক পরিসরে নববর্ষের মানবিক ছোঁয়া: নববর্ষ উপলক্ষে কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারগুলোতে পরিবেশন করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খাবার। শিশুদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যা উৎসবকে আরো মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে। দেশের সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান উন্মুক্ত রাখা হয়েছে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রাখা হয়েছে বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা: নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। র‌্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে চেকপোস্ট, সিসিটিভি মনিটরিং এবং টহল ব্যবস্থা। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ডগ স্কোয়াডও সক্রিয় রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে-নববর্ষ উদযাপনে কোনো ধরনের হুমকি নেই।

নাম বিতর্ক ও সংস্কৃতির প্রবাহমানতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শোভাযাত্রা একসময় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত ছিল, যা ২০১৬ সালে ইউনেসকো স্বীকৃতি পায়। পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তন ও বিতর্কের মধ্যেও বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চা থেমে থাকেনি। এবারের আয়োজন ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম ধারণ করলেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজেদের মতো করে ঐতিহ্যকে বহন করছে। এটি প্রমাণ করে-সংস্কৃতি কখনো স্থির নয়, বরং সময়ের সঙ্গে প্রবাহমান এক জীবন্ত ধারা।

রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের বার্তায় সম্প্রীতি ও উন্নয়নের আহ্বান: রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, নববর্ষ আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। তিনি সমাজে বিভাজন দূর করে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বও নববর্ষকে উন্নয়ন, ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

প্রভাতে আলোর প্রতিজ্ঞা: আজকের পহেলা বৈশাখ তাই শুধু উৎসব নয়-এটি নতুন শপথের দিন। অতীতের গ্লানি পেরিয়ে বাঙালি আজ দাঁড়িয়ে আছে আলোর প্রত্যাশায়, নতুন সম্ভাবনার দিগন্তে।

এই নবপ্রভাতে একটাই উচ্চারণ-
পুরনো ক্লান্তি নয়, নতুন আলোয় গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ।
সানা/আপ্র/১৪/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সরকার ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স দেবে: ডিএসসিসি প্রশাসক
১৫ এপ্রিল ২০২৬

সরকার ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স দেবে: ডিএসসিসি প্রশাসক

সড়কের ফুটপাত ব্যবহার যেন অনুপযোগী হয়ে না পড়ে, সেজন্য তালিকা করে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের সরকার লাইসেন্স...

‘৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত ’
১৫ এপ্রিল ২০২৬

‘৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত ’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তার...

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবকে ভীষণভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে: ডা. জাহেদ
১৫ এপ্রিল ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবকে ভীষণভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে: ডা. জাহেদ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব বা গণপিটুনির মতো ঘটনাকে ভীষণভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছ...

১ জুলাই শুরু হবে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি: প্রধানমন্ত্রী
১৫ এপ্রিল ২০২৬

১ জুলাই শুরু হবে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি: প্রধানমন্ত্রী

১ জুলাই থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’ শুরু হতে যাচ্ছে। এ কর্মসূচির মা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই