অমিত রঞ্জন দে=====
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের কোনো অভাব নেই। একটি মুঠোফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর, মতামত ও জ্ঞান আমাদের সামনে হাজির হয়। কিন্তু তথ্যের এই বিস্ফোরণের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে আরেক সংকট; কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি যুক্তিসংগত আর কোনটি নিছক গুজব বা অপতথ্য, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতাও নতুন প্রযুক্তির হাত ধরে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রায় একশ বছর আগের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। কারণ ওই আন্দোলনের মূল প্রশ্ন ছিল, মানুষ কি নিজের বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করবে? প্রচলিত বিশ্বাস ও সামাজিক অনুশাসনকে কি প্রশ্ন করা যাবে? জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার আলোকে সমাজকে কি নতুনভাবে দেখা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো থেকেই বাংলায় গড়ে উঠেছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’।
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকার মুসলিম হলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হুসেন, আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবদুল কাদিরসহ একদল প্রগতিশীল সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুসলিম সাহিত্য-সমাজকে কেন্দ্র করে যুক্তিবাদ, মুক্তচিন্তা, মানবতাবাদ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার যে ধারা গড়ে ওঠে, সেটিই পরবর্তীকালে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে পরিচিত হয়।
তৎকালীন বাংলার মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সমকালীন জ্ঞানচর্চা থেকে পিছিয়ে ছিল। অশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক রক্ষণশীলতা মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। এই বাস্তবতায় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত চিন্তাবিদেরা উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজ বদলাতে হলে মানুষের চিন্তার জগতেও পরিবর্তন আনতে হবে। প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা এবং নতুন জ্ঞান গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কোনো ধর্মবিরোধী আন্দোলন ছিল না। ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধ শাস্ত্রানুগত্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তি ও মানবিকতার পক্ষে অবস্থান নেওয়াই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ অবশ্য এই অবস্থান সহজভাবে নেয়নি। আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় লেখকদের ধর্মবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাদের ওপর অপপ্রচার ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। কিন্তু তাদের মূল অবস্থান ছিল অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং যুক্তি ও মানবকল্যাণের আলোকে জীবন ও সমাজকে দেখা।
কাজী মোতাহার হোসেনের ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধে এমন এক সামাজিক বাস্তবতার সমালোচনা করা হয়েছিল, যেখানে গান, ছবি আঁকা, খেলাধুলা ও আনন্দের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। মানুষের জীবনে শিল্প, সৌন্দর্য, আনন্দ ও সৃজনশীলতার প্রয়োজন আছে, এই মানবিক বোধকে তিনি সামনে এনেছিলেন। আজও এই প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গান, কবিতা, নাটক, চিত্রকলা ও সংস্কৃতিচর্চা মানুষের অনুভূতি, কল্পনা ও মননকে বিকশিত করে। সংস্কৃতির পরিসর সংকুচিত হলে মানুষের প্রশ্ন করার ক্ষমতা ও সহনশীলতার জায়গাটিও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চিন্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘শিখা’ পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর বিখ্যাত বাণী ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। এই বাক্যের মধ্যেই আন্দোলনের মূল দর্শন নিহিত রয়েছে। জ্ঞান ছাড়া স্বাধীন চিন্তা সম্ভব নয়। আবার প্রশ্ন করার স্বাধীনতা ছাড়া জ্ঞানও মানুষের মুক্তির পথ তৈরি করতে পারে না।
এই আন্দোলন কোনো একজন মানুষের চিন্তার ফসল ছিল না। কাজী আবদুল ওদুদ বিশ্বজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতির বৃহত্তর ধারার সঙ্গে বাঙালি মুসলমান সমাজকে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের প্রবক্তা। আবুল হুসেন প্রচলিত কর্তৃত্ব ও সামাজিক বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সাহসী কণ্ঠ ছিলেন। আবুল ফজল মুক্তচিন্তাকে সাহিত্য ও মানবিক জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও মানুষের মুক্তি। আবদুল কাদির সাহিত্য, গবেষণা ও সম্পাদনার মাধ্যমে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তুলতে কাজ করেছিলেন।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সাংগঠনিক তৎপরতা ১৯৩০-এর দশকে স্তিমিত হয়ে পড়লেও এর চিন্তা সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তী সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের নানা ধারায় তা প্রবাহিত হয়েছে। ১৯৪০ সালে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের প্রথম সম্মেলনের উদ্বোধক ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ। পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের মধ্য দিয়েও মুক্তচিন্তার এই ধারা নতুন শক্তি পায়। তবে আন্দোলনের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না থাকায় এর মুক্তচিন্তার আদর্শ বৃহত্তর সমাজে প্রত্যাশিত পরিসরে বিস্তার লাভ করতে পারেনি।
আজকের বাংলাদেশ একশ বছর আগের বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দিক থেকেই ভিন্ন। শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৌঁছেছে, জ্ঞানের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অসহিষ্ণুতা, নারীবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ মনোভাবও বিভিন্নভাবে টিকে আছে।
আগে তথ্যের অভাব ছিল; এখন তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ। আগে গুজব ছড়াতে সময় লাগত; এখন একটি পোস্ট বা ভিডিও কয়েক মিনিটে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। মানুষ অনেক সময় এমন তথ্যই বিশ্বাস করে, যা তার আগের ধারণাকে সমর্থন করে। ফলে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও মুক্তচিন্তার পরিসর সংকুচিত হতে পারে।
এই জায়গাতেই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শিক্ষা আজ নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য পেলেই বিশ্বাস নয়; প্রশ্ন করতে হবে, উৎস যাচাই করতে হবে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে হবে। নিজের বিশ্বাসকেও প্রয়োজনে প্রশ্ন করতে হবে। যে মত আমার পছন্দ নয়, সেটিও শুনতে হবে। কারণ ভিন্নমত মানেই শত্রুতা নয়।
বুদ্ধির মুক্তির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো প্রশ্ন করার সাহস। কোনো ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বলেই তা সত্য হয়ে যায় না। আবার নতুন কোনো ধারণা শুধু নতুন বলেই সত্য নয়। দুটোকেই যুক্তি, তথ্য ও মানবিকতার আলোকে যাচাই করতে হবে। আজ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের একশ বছর নিয়ে কথা বলা মানে একশ বছর আগের সংগঠন বা ভাষা হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়; বরং তার মূল চেতনাকে নতুন বাস্তবতায় প্রয়োগ করা। আমাদের প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, বরং প্রশ্ন করতে শেখায়। প্রয়োজন এমন গণমাধ্যম, যেখানে যাচাই করা তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রয়োজন এমন সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে গান, নাটক, সাহিত্য, চিত্রকলা ও বিতর্ককে সমাজের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হবে।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাস ধারণ করতে পারবে, আবার প্রয়োজন হলে ওই বিশ্বাসকে যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করার স্বাধীনতাও পাবে। কারণ চিন্তার মুক্তি ছাড়া মানুষের সামগ্রিক মুক্তি অসম্পূর্ণ।
প্রায় একশ বছর আগে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন যে প্রশ্ন তুলেছিল, আজও আমাদের সামনে সেই প্রশ্নগুলো ফিরে আসে, আমরা কি প্রচলিত ধারণাকে যুক্তির আলোকে বিচার করতে প্রস্তুত? আমরা কি ভিন্নমত শুনতে পারি? সত্য জানার প্রয়োজনে নিজের ধারণাকেও প্রশ্ন করতে পারি? ধর্মকে কি মানবিকতা, যুক্তি ও উদারতার আলোকে দেখতে পারি?
শতবর্ষ পরও তাই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়। এটি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এমন একটি প্রবাহ, যার প্রয়োজন আজও ফুরিয়ে যায়নি। ‘শিখা’-এর ওই ঐতিহাসিক বাণী তাই আজও প্রাঞ্জল ও প্রাসঙ্গিক, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’।
বুদ্ধির মুক্তি মানে শুধু স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার নয়; সত্যকে জানার, প্রশ্ন করার, তথ্য যাচাই করার, ভিন্নমত শোনার এবং মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর স্বাধীনতাও। অন্ধ অনুসরণের বদলে যুক্তি, সংকীর্ণতার বদলে উদারতা, অসহিষ্ণুতার বদলে সংলাপ এবং কুসংস্কারের বদলে জ্ঞান; এই চর্চাই বুদ্ধির মুক্তির পথকে এগিয়ে নিতে পারে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
সানা/আপ্র/২৩/৯/২০২৬