গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

ছেলেকে না পেয়ে তার বাবাকে গ্রেফতার: রাষ্ট্র কি আবার সেই পথেই হাঁটছে?

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:০৭ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০২:৩০ এএম ২০২৬
ছেলেকে না পেয়ে তার বাবাকে গ্রেফতার: রাষ্ট্র কি আবার সেই পথেই হাঁটছে?
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবি

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির=====
একজনকে গ্রেফতার করতে গিয়ে তাকে পাওয়া গেলো না। এরপর পুলিশ তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করলো তার ৬০ বছর বয়সী বাবাকে। ঘটনাটি ঢাকার ধামরাইয়ের। গ্রেফতার হওয়া মোহাম্মদ কলিম উদ্দিন একজন কৃষক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তার পরিবারের বক্তব্যের পাশাপাশি পুলিশের বক্তব্যও এসেছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কলিম উদ্দিনের নামে আগে কোনো মামলা ছিল না এবং তিনি আওয়ামী লীগের কোনো পদধারী নেতাও নন। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক; এমন তথ্যের ভিত্তিতে একটি ‘পেন্ডিং মামলায়’ গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এই ঘটনাটি তাই কেবল একটি গ্রেফতারের ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামনে আরো বড় একটি প্রশ্ন হাজির করে; একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে তার নিজের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলেও পরিবারের সদস্যের রাজনৈতিক পরিচয় কি তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে?

উত্তরটি বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের কাঠামোর মধ্যেই স্পষ্টভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী, কেবল আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। আর ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেফতার ও আটক ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে; গ্রেফতারের কারণ জানানো, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার মতো মৌলিক অধিকার এর অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৈধতা নির্ভর করে সেই ক্ষমতা কেন, কীভাবে এবং কার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার ওপর।

ফৌজদারি কার্যবিধির বর্তমান বিধানেও গ্রেফতারের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত অভিযোগ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা যুক্তিসংগত সন্দেহ এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রেফতারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। গ্রেফতারের কারণ লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করার বিধানও রয়েছে। সুতরাং একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের আইনগত ভিত্তি যদি তার নিজের কর্মকাণ্ড ও সংশ্লিষ্টতার ওপর নির্ভর করে, তাহলে তার সন্তান কী করেন, কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কিংবা তার রাজনৈতিক পরিচয় কী; সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবার বিরুদ্ধে অপরাধের ভিত্তি হয়ে যেতে পারে না।

এখানেই ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার মৌলিক নীতিটি গুরুত্বপূর্ণ। ফৌজদারি আইনে দায় ব্যক্তির, পরিবারের নয়। বাবা তার সন্তানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী নন, যেমন সন্তানও বাবার রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়ী নন। এই সহজ নীতিটি যদি রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে আইনের শাসনের জায়গায় প্রতিশোধ, ভয় এবং পারিবারিক দায় চাপানোর সংস্কৃতি জায়গা করে নিতে পারে।

এখানে আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে না। এর একটি গভীর সামাজিক প্রভাব রয়েছে। একজন নাগরিক যদি মনে করেন, তার পরিবারের কোনো সদস্যের রাজনৈতিক পরিচয় বা কর্মকাণ্ডের কারণে তাকেও যেকোনো সময় গ্রেফতার করা হতে পারে, তাহলে তিনি শুধু রাষ্ট্রের কাছেই নিরাপত্তাহীন বোধ করবেন না; তিনি তার নিজের মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক পরিচয় এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়েও ভীত হয়ে পড়বেন।

আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আটক, মিথ্যা মামলা, গায়েবি মামলা ও হয়রানিকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির উপায় হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। সরকার পরিবর্তনের পর নাগরিকদের একটি বড় প্রত্যাশা ছিল; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণে পরিবর্তন আসবে, আইন প্রয়োগ হবে নিরপেক্ষভাবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই বর্তমান ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

কারণ সরকার পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; রাষ্ট্রীয় আচরণের পরিবর্তনও হওয়া উচিত। অতীতে যে সংস্কৃতির সমালোচনা করা হয়েছে, সেই সংস্কৃতি নতুন কোনো নামে বা নতুন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে ফিরে এলে তার মৌলিক চরিত্র বদলায় না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে একই ধরনের সুরক্ষা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এর ৯ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার স্বীকৃত এবং নির্বিচার গ্রেফতার বা আটকের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

এখানে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক হলেই তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা যাবে না; এমন কথা কেউ বলছে না। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা কর্মীর বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আইন প্রয়োগের ভিত্তি হতে হবে ব্যক্তির নিজের কর্মকাণ্ড, অভিযোগ ও প্রমাণ; তার পরিবারের পরিচয় নয়।

এই ঘটনাটি তাই একটি মৌলিক নীতির পরীক্ষা। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে আইন অপরাধের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করবে? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে কাউকে না পেলে তার পরিবারের কাউকে ধরে এনে একটি বার্তা দেওয়া হবে?

আইনের শাসন মানে শুধু আইন থাকা নয়। আইনের শাসন মানে রাষ্ট্র নিজেও আইনের সীমার মধ্যে থাকবে। পুলিশ অপরাধ তদন্ত করবে, অভিযুক্তকে খুঁজবে, প্রমাণ সংগ্রহ করবে এবং আদালতের সামনে উপস্থাপন করবে। কিন্তু অভিযুক্তকে না পেয়ে তাঁর বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যকে গ্রেফতার করা যদি চর্চায় পরিণত হয়, তাহলে তা আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

মোহাম্মদ কলিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে তার নিজের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত অভিযোগ না থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এ ঘটনার আইনগত ভিত্তি, গ্রেফতারের কারণ এবং পুলিশি পদক্ষেপের যথার্থতা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, সরকারকে এখনই একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে; পরিবারের পরিচয় অপরাধের দায় তৈরি করবে না, রাজনৈতিক পরিচয় স্বাধীনতা হরণের স্বয়ংক্রিয় কারণ হবে না এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো নাগরিককে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হতে পারে না।

আমরা অতীতের যে সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছি, সেটি যেন নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে ফিরে না আসে। কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র তখনই বদলায়, যখন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা দলের পরিচয় বদলানোর পাশাপাশি নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণও বদলে যায়।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশকে শক্তিশালী হতে হবে, কিন্তু সেই শক্তি নাগরিককে ভয় দেখানোর জন্য নয়; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। সরকারকে ক্ষমতাবান হতে হবে, কিন্তু সেই ক্ষমতা নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য। আর নাগরিককে নিরাপদ বোধ করতে হবে, কারণ তার পরিবারে কে রাজনীতি করেন, তিনি কী মত পোষণ করেন কিংবা তার সঙ্গে কার রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে; তার জন্য তার ব্যক্তিস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হবে না।

শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি গ্রেফতার করার ক্ষমতা নয়; বরং এমন একটি ন্যায়সংগত আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কাউকে অন্যের অপরাধের দায় বহন করতে হয় না।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী
সানা/আপ্র/২৩/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বুদ্ধির মুক্তি: একশ বছর পরও যে প্রশ্নগুলো আমাদের তাড়া করে
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বুদ্ধির মুক্তি: একশ বছর পরও যে প্রশ্নগুলো আমাদের তাড়া করে

অমিত রঞ্জন দে===== আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের কোনো অভাব নেই। একটি মুঠোফোনের পর্দা...

তেলের দাম বৃদ্ধি : অর্থনীতির ঘরে কি আগুন লাগবে?
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তেলের দাম বৃদ্ধি : অর্থনীতির ঘরে কি আগুন লাগবে?

সাইফুল ইসলামতেলের দাম বাড়লে শুধু তেলের দামই বাড়ে- এমন সরল অর্থনীতি পৃথিবীতে কোথাও নেই। তেল এমন এক পণ...

আমাদের সময়, আমাদের দায়
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমাদের সময়, আমাদের দায়

শাকিল কবিরকখনো কখনো মনে হয়, আমরা শুধু একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি না, বরং একটি কঠিন সামাজিক পরীক্ষার...

অযোগ্যতার চেয়েও বিপজ্জনক আত্মঅজ্ঞতা
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অযোগ্যতার চেয়েও বিপজ্জনক আত্মঅজ্ঞতা

ড. খালিদুর রহমানএকজন মানুষ অযোগ্য হতে পারেন। জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাব...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাস ভাড়া বাড়লো কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনকর্মীদের কেউ কেউ। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসেও গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন বাস ভাড়ার এই নৈরাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 1 ঘন্টা আগে