আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ক্যাম্প। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ভালো করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করলেও শুরুতেই কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দল।
ফিফা উইন্ডোর কারণে প্রথম ম্যাচে হামজা চৌধুরীকে না পাওয়া, প্রকৃত স্ট্রাইকারের অভাব, সাফের খেলোয়াড় নিবন্ধনের নিয়ম এবং দলীয় গ্রুপিং নিয়ে গুঞ্জন, সব মিলিয়ে চিন্তায় রয়েছেন প্রধান কোচ থমাস ডুলি।
ক্যাম্পের প্রথম দিন রোববার টিম হোটেলে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দলের প্রস্তুতি, খেলোয়াড় নির্বাচন ও মাঠের বাইরের বিতর্ক নিয়ে কথা বলেন ডুলি। তবে সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও খেলোয়াড়দের সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখছেন তিনি।
জাতীয় দলের ক্যাম্পে শুরু থেকেই সব খেলোয়াড়কে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বিদেশি লিগে খেলা ফুটবলারদের ক্ষেত্রে ফিফার আন্তর্জাতিক বিরতি ও ক্লাবের ছাড়পত্র গুরুত্বপূর্ণ। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
হামজাকে সাফের প্রথম ম্যাচে পাওয়া যাবে কি না, এমন প্রশ্নে ডুলি স্পষ্ট করে জানান, তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। হামজা ও ফাহান আলী ওয়াহেদ ৮ বা ৯ নভেম্বরের দিকে দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য তাদের পাওয়ার আশা করছেন কোচ। ডুলি বলেন, ‘ফিফা উইন্ডোর কারণে আমরা শুরু থেকেই পুরো স্কোয়াড পাইনি। যারা উঁচু পর্যায়ের লিগে খেলে, তাদের ক্লাবগুলো চাইলেই খেলোয়াড় ছাড়তে পারে না, কারণ তাদের নিজেদের খেলা থাকে। ফিফা বছরে মাত্র পাঁচবার এমন উইন্ডো রাখে, যখন ক্লাবগুলো খেলোয়াড় ছাড়তে বাধ্য।’
বর্তমানে ক্যাম্পে ২৩ থেকে ২৪ জন খেলোয়াড় রয়েছেন। নভেম্বরের ২ থেকে ৪ তারিখের মধ্যে স্কোয়াড পূর্ণাঙ্গ হবে বলে আশা করছেন ডুলি। হামজা ক্লাবের হয়ে লাল কার্ড দেখলে হয়তো আগে আসতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তা না হলে ৯ নভেম্বর বা ম্যাচের পরপরই তাকে ছাড়তে পারে ক্লাব। বাংলাদেশ ফুটবলের দীর্ঘদিনের সমস্যা প্রকৃত স্ট্রাইকারের অভাব। প্রতিপক্ষের বক্সে গোলের সুযোগ তৈরি ও তা কাজে লাগানোর মতো নির্ভরযোগ্য সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড খুঁজছে দল।
সাফের জন্য ঘোষিত ২৮ সদস্যের প্রাথমিক স্কোয়াডে শাকিল আহাদ তপু জায়গা না পেলেও সুযোগ পেয়েছেন মাহিন খান ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ভালো করা রোনান সুলিভান। স্ট্রাইকার নির্বাচন নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ডুলি। তার মতে, একজন প্রকৃত ‘নাম্বার নাইন’-এর শারীরিক লড়াইয়ে টিকে থাকা, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা এবং গোলের সুযোগ কাজে লাগানোর সামর্থ্য থাকতে হবে।
ডুলি বলেন, ‘সবাই জানে আমরা একজন নাম্বার নাইন খুঁজছি এবং আমাদের হাতে সেটা নেই। একজন সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ডের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। তাকে গোলরক্ষক বা ডিফেন্ডারের সামনে গিয়ে বলের প্রথম স্পর্শটা নেওয়ার সাহস দেখাতে হয়।
বিপক্ষ দলের সবচেয়ে শক্তিশালী ডিফেন্ডার আপনাকে কনুই দিয়ে, হাঁটু দিয়ে আঘাত করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যদি বক্সে গিয়ে শারীরিক লড়াইয়ে ভয় না পান এবং যেখানে ব্যথা পাওয়ার ভয় আছে, সেখানেও নির্ভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন, তবেই আপনি একজন প্রকৃত নাম্বার নাইন। আমাদের তেমন কেউ নেই। মাহিন খান ও রুম্মানকে আমরা ঠিক এই শূন্যতা পূরণের জন্যই দলে রেখেছি।’
তপুসহ বাদ পড়া অন্যদের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল না বলেও জানান কোচ। তার মতে, স্ট্রাইকার হিসেবে গোল করতে না পারলে অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়াই স্বাভাবিক। খেলোয়াড় নির্বাচনে অনুশীলন ও ম্যাচের পারফরম্যান্সকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
ঘরোয়া লিগে ভালো করা সৌরভ দেওয়ানকে বিবেচনায় না নেওয়ার বিষয়ে ডুলি বলেন, সাফের জন্য এই মুহূর্তে যারা পাওয়া যাবে না, তাদের নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। আপাতত বর্তমান স্কোয়াড নিয়েই কাজ করতে চান তিনি।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট শুরুর প্রায় তিন সপ্তাহ আগে, ১৮ অক্টোবরের মধ্যে ২৮ সদস্যের খেলোয়াড় তালিকা জমা দিতে হয়েছে দলগুলোকে।
এই সময়ের মধ্যে কোনো খেলোয়াড় চোটে পড়লে বিকল্প নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। নিয়মটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ডুলি। তিনি বলেন, ‘আমি এই নিয়মটা একেবারেই পছন্দ করিনি। গতকাল ম্যাচ খেলে আসা একজন খেলোয়াড় আজ হাঁটুতে ব্যথা নিয়ে ক্যাম্পে আসতে পারে। তখন আমরা কী করব?
আমাদের কিছুই করার নেই, তাকেই খেলানোর জন্য প্রস্তুত করতে হবে।’ তপুও ফিরে এসে কিছুটা সমস্যায় পড়েছিলেন উল্লেখ করে ডুলি বলেন, টুর্নামেন্টের এত আগে তালিকা জমা দেওয়ার পর পরিবর্তনের সুযোগ না থাকাটা দলের জন্য বড় সমস্যা। তার মতে, এই নিয়মের কারণে কোচদের বাড়তি জটিলতা সামলাতে হচ্ছে। আসিয়ান কাপের পর বাংলাদেশ দলের শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
খেলোয়াড়দের সময়ানুবর্তিতা এবং স্থানীয় ও প্রবাসী ফুটবলারদের মধ্যে গ্রুপিং নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ডুলি। তার ব্যাখ্যা, খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে সতেজ রাখতে কিছু স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
সকালের নাশতার সময় সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত নির্ধারিত থাকায় কেউ আগে, কেউ পরে খেতে পারেন। এটিকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখতে চান না তিনি। ডুলি বলেন, ‘শৃঙ্খলা নেই, এই কথা কে বলল? আমাদের এমন কোনো নিয়ম নেই যে এটা করলে শাস্তি দেওয়া হবে।
আমরা সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ওপেন ব্রেকফাস্টের নিয়ম রেখেছি। কেউ ৮টায় খেতে চায়, কেউ আরেকটু ঘুমিয়ে ৯টায় খায়। এটাকে কেউ কেউ শৃঙ্খলাভঙ্গ বলতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটা স্বাভাবিক।’ তবে মাঠে কেউ নিজের দায়িত্ব পালন না করলে ছাড় দেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেছেন কোচ। তার ভাষায়, মাঠে কেউ কাজ না করলে কিংবা হামজার মতো লড়াই না করলে তাকে পরিণতি ভোগ করতে হবে।
দলে গ্রুপিংয়ের অভিযোগও নাকচ করে দেন ডুলি। তিনি বলেন, ‘দলে কোনো গ্রুপিং নেই। ২৮ জন খেলোয়াড় এক টেবিলে বসে খেতে পারে না। সবাই তার পছন্দের মানুষের সঙ্গে বসে। হামজা বা যুক্তরাজ্যের ছেলেরাও একসঙ্গে এক টেবিলে বসে। তার মানে কি এই যে তারা অন্যদের অপছন্দ করে? মোটেও না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডাইনিং টেবিলে আমরা আলাদা বসতেই পারি, কিন্তু মাঠ একটাই এবং সেখানে আমরা একে অপরের জন্যই কাজ করি। ফেসবুকে যারা এসব লেখে, তারা স্রেফ টাকা আর ক্লিকের জন্য গুজব ছড়ায়।
এসব মিথ্যা আর বানোয়াট গল্প।’ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক থাকলেও সাফে ভালো করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ডুলি। খেলোয়াড়দের সামর্থ্যের ওপর তার আস্থা রয়েছে। তবে জাতীয় দলের জার্সিতে ঘরোয়া ফুটবলের পারফরম্যান্স ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ডুলি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমরা পারব। আমি খেলোয়াড়দের সামর্থ্যে বিশ্বাস রাখি। তারা রোবট নয়, মানুষ। তাদেরও ভুল হতে পারে।
তবে ঘরোয়া লিগে বা কিংসের হয়ে তারা যে অসাধারণ ফুটবলটা খেলে, সেটা যদি জাতীয় দলের জার্সিতেও তুলে ধরতে পারে, তবে আমাদের ঠেকানো কঠিন।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক মন্তব্য খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে বলেও মনে করেন তিনি।
এসব থেকে দূরে থেকে খেলোয়াড়েরা শতভাগ মনোযোগ ও অনুপ্রেরণা নিয়ে খেলতে পারলে সাফে ভালো ফল সম্ভব বলে বিশ্বাস তার। এখন নজর নভেম্বরের ২ থেকে ৪ তারিখের দিকে। ওই সময়ের মধ্যে স্কোয়াডের বাকি সদস্যরা যোগ দিলে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি শুরু হবে। হামজাকে প্রথম ম্যাচে না পাওয়া এবং প্রকৃত স্ট্রাইকারের অভাব সামলে দলকে সাফের জন্য প্রস্তুত করাই এখন ডুলির বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিসি/আপ্র/২৫/১০/২০২৭