উন্নত জীবনমান ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে জন্মহার কমার সম্পর্ক বহুদিনের পরিচিত বাস্তবতা। তবে গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে জন্মহারে প্রায় একই ধরনের পতন গবেষকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক দুটি গবেষণায় এই প্রবণতার পেছনে স্মার্টফোনের বিস্তার, বিশেষ করে আইফোনের আবির্ভাবকে সম্ভাব্য একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রতি এক হাজার নারীর বিপরীতে জন্মহার ৬৫ থেকে ৭০-এর মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে তা কমতে শুরু করে। ২০২৪ সালে এই হার নেমে আসে ৫৪-এ, যা ১৭ বছরে প্রায় ২২ শতাংশ হ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় আইফোন ব্যবহারের সুযোগ বেশি ছিল, সেসব অঞ্চলে জন্মহার তুলনামূলক দ্রুত কমেছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে জন্মহার ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশ এবং ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। গবেষকদের হিসাবে, ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের জন্মহার হ্রাসের ৩৩ থেকে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের জন্মহার ৭০ শতাংশ এবং ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৪৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার কমেছে মাত্র ৭ শতাংশ। আর ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে জন্মহার ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
গবেষকদের মতে, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মানুষের সামাজিক আচরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। বাইরে সময় কাটানোর প্রবণতা কমেছে, যৌন সক্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে এবং পর্নোগ্রাফিভিত্তিক কনটেন্ট দেখার প্রবণতা বেড়েছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত কনটেন্ট দেখার হার ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়া স্মার্টফোনের মাধ্যমে গর্ভনিরোধ, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং গর্ভপাতসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য হওয়াও জন্মহার কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের ১২৮টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির আরেক গবেষণায়ও একই ধরনের প্রবণতা পাওয়া গেছে। গবেষণাটিতে দেখা যায়, স্মার্টফোনের বিস্তারের সঙ্গে কিশোরীদের জন্মহার হ্রাস প্রায় একই সময়ে বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে। ইরান, কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, চিলি, মেক্সিকো ও তুরস্কের মতো দেশেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষকদের ভাষ্য, এটি একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত অভিঘাতের ফল হতে পারে, যা বিভিন্ন দেশে প্রায় একই সময়ে সমাজ ও জনসংখ্যাগত আচরণে প্রভাব ফেলেছে।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, জন্মহার কমার একমাত্র কারণ আইফোন বা স্মার্টফোন নয়। বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত নানা উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবেই এই পরিবর্তন ঘটছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশে জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কানাডা, জাপান, সিঙ্গাপুর ও স্পেনেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে জনসংখ্যা সংকোচনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিলের মতো মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও জন্মহার দ্রুত কমে আসছে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
সানা/আপ্র/১০/৬/২০২৬