অপ্রতিমের জন্য হাহাকার
আহনাফ আবদুল কাদির
তেরো বছর বয়স মানে
মায়ের আঁচল ছেড়ে
একটু একটু করে পৃথিবী চিনে নেওয়া,
তেরো বছর মানে
খাতার পাতায় ভবিষ্যৎ আঁকা,
বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে হাসতে
বাড়ি ফেরার কথা।
অপ্রতিমেরও ছিল এমনই এক পৃথিবী।
ছিল কত অসমাপ্ত গল্প,
কত না-বলা কথা,
কত ছোট ছোট স্বপ্ন।
আজ সেই স্বপ্নগুলো
সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে আছে,
আঘাতে আঘাতে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে
অপ্রতিমের সমস্ত দেহ।
মা আজও তার অপেক্ষায়
দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন,
মনে হচ্ছে, এই তো-
ছেলেটা এখনই ডাকবে,
‘মা, আমি এসেছি।’
পরক্ষণেই তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
‘আমার একটাই এটুকুন ছোটো সন্তান, অপ্রতিম
আর কোনদিনও ফিরবে না।
ডাকবে না আমাকে
কোনোদিন মা বলে ডাকবে না।’
অপ্রতিমের জন্য শোক; অথচ কথা ছিল...
তানজিদ শুভ্র
অথচ কথা ছিল, এ পৃথিবী হবে ওদের বাসযোগ্য স্থান,
একটু একটু করে ঘুচিয়ে দেব যতেক অসম্মান।
কথা ছিল কোনো শিশুর চোখে থাকবে না আর ভয়,
মায়ের বুকেও জমবে না আর হারানোর সংশয়।
কথা ছিল স্কুল হবে ওদের নিরাপদ আশ্রয়,
শিক্ষকের কাছে পাবে আলো আর মমতার প্রশ্রয়।
কথা ছিল মাদরাসাতেও ফুটবে বিশ্বাসের ফুল,
লালসার বিষে ঝরবে না কোনো নিষ্পাপ শিশু-মুকুল।
কথা ছিল ঘরের ভেতর থাকবে আদরের ছায়া,
গৃহকর্মী শিশুটিও পাবে মানুষ হওয়ার মায়া।
কথা ছিল পথের ধারে খেলবে ওরা নির্ভয়ে,
ত্রাসের থাবা গ্রাস করবে না ওদের অসময়ে।
অথচ আজও শিশু হারায়, নিভে যায় তার প্রাণ,
মায়ের কোল শূন্য করে থেমে যায় কলতান।
কোথাও নির্যাতনের ক্ষত, কোথাও কান্নার রোল,
কোথাও আবার লাশ হয়ে ফেরে আদরে ভরানো কোল।
একজন মা সারারাত ছুটে খুঁজেছেন সন্তান,
‘ফিরে আয়’ ডাকে কেঁপে উঠেছে অন্ধকারের প্রাণ।
সকালের আলো ফুটল যখন, জমল পাড়ায় ভিড়,
ফিরল না অপ্রতিম, ফিরল নিথর এক শরীর।
আমরা কি তবে শুধুই এমন শোকের খবর লিখব?
দুদিন কেঁদেই নিয়তি মেনে সবকিছু ফের ভুলব?
আবার কোনো শিশুর ছবি উঠবে খবরের পাতায়?
আবার কোনো মা সন্তান খুঁজবে আর্তনাদের ব্যথায়?
কত অশ্রু ঝরলে তবে বদলাবে এই কাল?
কত শিশুর মৃত্যু হলে ভাঙবে মোহের জাল?
কত ঘর পুড়লে বুঝব আগুন কী ভয়ঙ্কর!
কত শিশু হারালে জানব, বিপন্ন এই ঘর?
তাই আজ অঙ্গীকার হোক, শুধু শোক নয়,
শিশুর সুরক্ষাই হোক আমাদের প্রথম প্রত্যয়।
ঘর থেকে স্কুল, পথ কিংবা মাদরাসার দ্বার,
মুক্ত থাকুক শিশুর জন্য, ঘুচুক অন্ধকার।
অপরাধীর বিচার হোক, হোক ভয়ের অবসান,
নির্যাতিত শিশুর পাশে দাঁড়াক প্রতিটি প্রাণ।
কোনো অপ্রতিম যেন অকালে হারিয়ে না যায়,
কোনো মা যেন সন্তানের লাশ বুকে না জড়ায়।
একদিন যেন মাথা উঁচু করে বলতে পারি নির্ভয়ে,
শিশুরা বাঁচুক এ পৃথিবীতে আনন্দ আর জয়ে।
সুকান্তের ওই স্বপ্নগুলো পাক না সার্থকতা,
নবজাতকের কাছে রাখা হোক সব প্রতিশ্রুতি-কথা।
সমান-সমান
মোঃ রহমত আলী
যারা ছিল, তারা তো এখন আর নেই,
যারা আছে, তারাও চলে যাওয়ার পথে,
যারা আসবে, তারা ক্ষণিকের মেহমান,
যারা চলে গেছে তারাই বেঁচে গেছে!
যারা থাকতে চায়, তারা যেতে হবে বাধ্য॥
তারা কোথায়, যারা ভেবেছিল যাবেনা,
তারাও তো বিলীন, কালক্রমে মাটির গর্ভে,
তারা আজও আছে ইতিহাস সাক্ষী,
তারা যারা ছিল সব একদম সত্যবাদী!
তারা চলে গেছে তবুও যুগের ইতিহাস॥
যারা যোগ্য ছিলে, তারা অযোগ্য হলো,
যারা সবল ছিলে, তারা আজি দুর্বল,
যারা অত্যাচারী, তারা একদা হবে নির্মূল,
যারা ধৈর্যশীল, তারাই মূল সময়ে সার্থক!
যারা সত্য জেনেও, ভান ধরে অজানাই,
যারা করে মিথ্যাচার, তারাই পরাজিত॥
তারা দুষ্ট নির্বোধ, যারা করে হক হরণ,
যারা সাক্ষ্য দেয় মিথ্যা, যারা করে বরণ,
তারা জবাবদিহিতায় কি বলবে তখন?
যারা নির্যাতিত, তারা জেগে হবে উৎফুল্ল,
যারা করে অবিচার, দেখবে তারা সেদিন
ন্যায়বিচার, ইনসাফ শেষ সমানে-সমান॥
নামে-কামে বড্ড অমিল
মো. মাহবুবুর রহমান
ইনসাফ আলীর মিথ্যা রায়ে
হিম্মত আলীর জেল;
চান তালুকদার পথে ঘুমায়-
দেখো আজব খেল!
বাদশা মিয়া রিকশা চালায়,
গরিব উল্লার গাড়ি;
চিকন আলীর আশি কেজি,
শান ফকিরের বাড়ি।
রমজান আলী রোজার মাসে
তিন রোজা রয় দিনে;
আতর আলীর নোংরা গুণেই
সবাই তারে চেনে।
শান্ত খানের ভয়ে নীরব
প্রতাপনগর গ্রাম;
ইজ্জত আলী লুকিয়ে চলে
এড়াতে বদনাম।
নামে-কামে বড্ড অমিল,
ষোলো কোটির দেশে;
এসব নিয়ে কেমনে লিখি-
কেঁদে নাকি হেসে?
রুপালি কাশফুল
বিলকিস নাহার মিতু
নীল আকাশে চেয়ে দেখো
ভাসছে সাদা ভেলা,
কাশবনেতে কাশফুলেদের
লুকোচুরি খেলা।
পরাগগুলো যায় ছড়িয়ে
হাওয়ায় ভেসে ভেসে,
নদী তীরের রূপ বাড়ালো
কাশবনেরা এসে।
দুলছে নদীর ঢেউয়ের মতো
রুপালি কাশফুল,
কেউবা মাখে সারা গায়ে
কেউবা সাজায় চুল।
খৈয়াম কাদেরের গুচ্ছ কবিতা...
স্ফুরণের গীত
নদীর সাথে নারীর দেখা হলে
রূপের অরূপে তারা বিমোহিত হয়,
রূপে রূপে করে মাখামাখি
দ্বিত্বের দ্বৈরথ ভেঙে অস্তির একত্বে মিশে যায়!
জলের চিতায় জ্বলে সৃষ্টি-তাড়নার দ্যুতি
দৃশ্যের আবিরে সব দৃশ্যাতীত হয়ে যায়;
সেই তাপে স্নান করে নিমগ্ন হৃদয়
মনে হয় সিজদায় পড়েছে নুইয়ে আনাল হকের ভঙিমায়!
প্রত্নকালের এই প্রবীণ জল
বীজের উদরে ঢালে স্ফুরণের গীত,
শারদীয় শিশিরের প্রেম লুফে নেয়
রোদের চুম্বনে আঁকে ভাবের সংবিত!
নদীর ভেতরে নারী, নারীর ভেতরে নদী খেলা করে
নারী-নদী মকরন্দ-সুধা, জলের আকাশে ওড়ে!
কষ্টের সিম্ফনি
স্মৃতি নীল হলে নিজেকে অমর মনে হয়,
মনে হয় ইতিহাস যেন এক কবরের মমি;
ভোলা তো যায় না কিছু, বারবার সব মনে পড়ে
স্মৃতির মিনারে ওড়ে বিস্মৃত কালের ঘুড়ি!
বদলের স্বপ্ন শেষে আগের দৃশ্যই ফিরে আসে,
কৌমের ভূমিতে ঝরে বিবিধ বৃষ্টির পানি;
বাবার পীড়িত মুখ রঙের ফানুসে নড়েচড়ে,
মায়ের হেঁসেলে পোড়ে কষ্টের সিম্ফনি!
পাখিনগরের যত গান, যত সরোদের সুর
বেজে বেজে সরে যায়, সরে যায় দূর-বহুদূর।
শরীর ছোঁব না
কতদূর যাবে?
আমার মনও ঠিক ততদূর যাবে;
মতি-চাঞ্চল্যে যখন বেঘোরে মাড়িয়ে যাও প্রেমের ঠিকানা
বুঝেও বোঝ না- প্রেমকে মাড়ানো আদৌ সহজ না!
যে গলিতে রোজ হেঁটে যাও, যে বাজারে
করো বেচাকেনা; আমি তার পার্শ্ববাসী, খবর রাখো না।
তোমাকে রেখেছি আবেগের ইন্দ্রপুরে,
প্রেমাধিক প্রেমের কবুলে ঘিরে;
এ প্রেমে বিরহ নেই, অভিসার জেগে থাকে
স্মরণের ঘরে। প্রেমের স্মৃতিরা প্রতীক্ষার সর্বনাম
ভালোবেসে আমি তাই নিঃস্ব হবো না
প্রেমকে বাঁচাতে আমি শরীর ছোঁব না!
তুমি গেলে যাও, যেখানে ইচ্ছে চলে যাও, প্রেম যাবে না,
প্রেম কখনো যাওয়ার জন্য আসে না!
সকল দৃশ্যই মেকি
অনুবাদ করি, কথারা বদলে যায়
ভাবের ভেতরে তবু নিজেকেই দেখি
শত্রু মিত্র শেষে সকল দৃশ্যই মেকি
অলীক মেঘেরা সব বৃষ্টি গিলে খায়!
সান্তাল পাড়ায় শুনি নৃশব্দের ধ্বনি
আমলকী বনে শুনি তিতাস্বাদ বাঁশি
বারবার ফিরে যাই, ফের ফিরে আসি
প্রেমকে আহত করে কামের কিঙ্কিণী!
রমণী-কণ্ঠের ভাষা জলকেলি জানে
পাখির বাণীতে জাগে রমণের সুর
অভিমান হেঁটে যায় দূর বহুদূর
আবেগ অমর হয় বিরহের গানে!
ফুল-পাতা গুল্ম-লতা আলপথ চেনে
প্রলাপ পেরিয়ে তারা সংলাপ কেনে।
পলিটিক্স
গণিকা সত্যের পলিটিক্স গিলে
আমাদের নেতারা পবিত্র হন
তাদের বায়াতে শিখি
নিজেকে ভিখিরি করার মুর্শিদি গান।
তাদের পবিত্র নামে
মিছিল করি, স্লোগান দেই
ভুলে যাই ঘরের খবর
তাদের পকেটে রাখি আত্ম-সনদের খেই।
ওনারা রুহানি ছবকের ওলি
জীবনের সব গলি চেনেন, মানুষকে বানান মুরিদ
মানুষকে হরণ করেন, ভাঙেন গড়েন
মানুষকে নিঃস্ব করে মানুষেরই হয়ে যান সুহৃদ!
প্রত্যাবর্তনের মিথ
প্রদীপ্ত মোবারক
সময় রৈখিক নয়, তোমার অনুপস্থিতিও নয় কখনও,
ফিরে আসে নিঃশব্দে পরিত্যক্ত বিকেলের ছায়াপথে।
ছেড়ে আসি আলোকিত নগর, জনারণ্যের বহুস্বর,
তবু তোমার দিকেই ঝুঁকে থাকে অন্তর্লোকের মানচিত্র।
যাকে পাইনি কোনোদিন, সে-ই অধিকতর আপন,
অধিগম্য নয় বলেই তার দিকে দীর্ঘ যাত্রা।
রাত্রির গভীর কূপে ফেলে আসা উচ্চারণগুলি
তোমার নামের মতোই প্রতিধ্বনিত হয় বারবার।
বিরহ এখানে বিচ্ছেদ নয়, এক স্থগিত মহাকাল,
যেখানে প্রতীক্ষারাও জেগে থাকে অনিদ্র গ্রহের মতো।
পলাশের বনে ঝরে পড়ে আরও কিছু রক্তিম সংরাগ,
ঋতুরা বদলায়, বদলায় না রাঁধার অভাব।
সময় বৃত্তাকারে ফেরায় অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো,
ফিরিয়ে আনে নষ্ট হয়ে যাওয়া সম্ভাবনার আলো।
তুমি ছিলে না কখনও, তবু সমস্ত প্রেমের কেন্দ্রে,
আমার মধ্যেই জন্ম নাও প্রতিদিন, অদম্য জাতিকা রূপে।
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬